ঘুম আমাদের জীবনেরই অংশ। সজাগ থাকার পর
ঘুম আসবে এটাই নিয়ম। মাঝেমধ্যে ঘুমে ব্যাঘাত সবারই হয়। বিশেষ করে
দুশ্চিন্তা বা মনোকষ্টের কারণে কয়েক দিন ঘুম না হওয়ার পর আবার সব স্বাভাবিক
হয়ে যায়। আমরা স্বাভাবিক ঘুমে ফিরে যাই। কিন্তু কখনো যদি ঘুম না হওয়ার
ব্যাপারটি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তাহলে আমরা মুষড়ে পড়ি, ডাক্তারের কাছে
দৌড়াই। মজার ব্যাপার হচ্ছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঘুম না হওয়ার কারণগুলো খুব
সাধারণ এবং প্রতিকারযোগ্য।
ঘুমের রকমফের
রাতের বিভিন্ন সময় আমরা বিভিন্ন ধরনের ঘুম ঘুমিয়ে থাকি। সেগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধরন হলো দ্রুত চক্ষু সঞ্চালন ঘুম। এ ধরনের ঘুম এই আসে, এই যায়। আমাদের মোট ঘুমের এক-পঞ্চমাংশ এ ধরনের ঘুম। এই ঘুমের সময় আমাদের মস্তিষক খুব সচল থাকে, চোখ দুটি এপাশ-ওপাশ দ্রুত সঞ্চালিত হয় এবং আমরা স্বপ্ন দেখি।
ঘুমের রকমফের
রাতের বিভিন্ন সময় আমরা বিভিন্ন ধরনের ঘুম ঘুমিয়ে থাকি। সেগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধরন হলো দ্রুত চক্ষু সঞ্চালন ঘুম। এ ধরনের ঘুম এই আসে, এই যায়। আমাদের মোট ঘুমের এক-পঞ্চমাংশ এ ধরনের ঘুম। এই ঘুমের সময় আমাদের মস্তিষক খুব সচল থাকে, চোখ দুটি এপাশ-ওপাশ দ্রুত সঞ্চালিত হয় এবং আমরা স্বপ্ন দেখি।
ঘুমের বাকি চার-পঞ্চমাংশ দ্রুত চক্ষু
সঞ্চালনবিহীন ঘুম। এই ঘুমের সময় আমাদের মস্তিষক থাকে খুব নিথর। এ সময়
বিভিন্ন হরমোন নিঃসৃত হয়ে তা রক্তে মেশে। সারাদিনের কাজে ক্ষয়প্রাপ্ত
শরীরের বিভিন্ন অংশ সারিয়ে তোলে এসব হরমোন।
কতটুকু ঘুম দরকার
আমরা কতটুকু ঘুমাব তা মূলত নির্ভর করে আমাদের বয়স ও পরিশ্রমের মাত্রার ওপর। কচি বাচ্চারা দিনে প্রায় ১৭ ঘণ্টা ঘুমায়। কিন্তু একটু বড় বাচ্চারা রাতে ৯-১০ ঘণ্টা ঘুমায়। রাতে ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানোই প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য যথেষ্ট। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমের প্রয়োজন কিছুটা কমে যায়। তাছাড়া দিনের বেলায় ঘুমালে রাতে ঘুম আসবে না-এটাই স্বাভাবিক।
ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে ঘুমের পরিমাণে বেশ
তফাত দেখা যায়। কেউ কেউ রাতে মাত্র ৩ ঘণ্টা ঘুমিয়েই চলতে পারে। কিন্তু
অধিকাংশ মানুষই তা পারে না। পরপর কয়েক দিন না ঘুমালে অধিকাংশ মানুষই
সারাক্ষণ ঘুম ঘুম বোধ করে, কোনো কিছুতে মনোযোগ দিতে পারে না।
ঘুম না হলে আপনি কষ্ট পাবেন-এটা খুবই
স্বাভাবিক। কিন্তু মাঝেমধ্যে দু-এক রাত ঘুম না এলে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু
নেই। মাঝে দু-এক রাত ঘুম না হলে তা আমাদের শারীরিক বা মানসিক স্বাস্থ্যের
খুব বড় ক্ষতি করে না। তবে যে কোনো কারণে লাগাতার বেশ কিছুদিন ঘুম না হলে
সারাক্ষণ ঘুম ঘুম লাগে এবং কোনো কিছুতে মনোযোগ দেয়া যায় না, সিদ্ধান্তহীনতা
দেখা দেয় আর বিষণ্নবোধ হয়। এ সময় গাড়ি চালানো বা ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ
করা খুব বড় বিপদের কারণ হতে পারে। গাড়ি চালানোর সময় ক্ষণিকের জন্য
ড্রাইভারের ঘুমিয়ে পড়াটা অনেক সড়ক দুর্ঘটনার কারণ।
অনিদ্রা
যাদের ঘুম সমস্যা আছে, তারা প্রায়ই অভিযোগ করে, তাদের যথেষ্ট ঘুম হচ্ছে না বা ঘুমিয়ে তৃপ্তি হচ্ছে না, যদিও সময় হিসাব করলে দেখা যাবে, ঘণ্টার হিসাবে তারা বেশ অনেকক্ষণ ঘুমাচ্ছেন। তবুও এই অভিযোগের কারণ, ঘুম ভেঙে ভেঙে যাওয়া। ঘুমের মধ্যে জেগে যাওয়ার অল্প সময়টুকু অনেক লম্বা মনে হয়। প্রতিদিন অনেক সাধারণ বিষয় আমাদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে যেমন-হয়তো শোয়ার ঘরটায় আওয়াজ বেশি, ঘরের তাপমাত্রা বেশি অথবা কম, বিছানা আরামদায়ক নয়, ঘুমের জন্য নির্দিষ্ট রুটিন মানা হচ্ছে না বা যথেষ্ট শারীরিক পরিশ্রম করা হচ্ছে না। রাতে খুব বেশি খেলে ঘুম আসতে চায় না আবার পেটে বেশি ক্ষুধা থাকলে ঘুম ভেঙে যায়। সিগারেট, অ্যালকোহল এবং ক্যাফিনযুক্ত খাবার যেমন-চা, কফি ইত্যাদি ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। শরীরের কোথাও ব্যথা বা গায়ে জ্বর থাকলেও ঘুম ঠিকমতো হয় না। তবে যদি দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের সমস্যা চলতেই থাকে তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। কারণ তা অধিকাংশ সময়ই মারাত্মক কিছুর ইঙ্গিত দেয়-হতে পারে তা ব্যক্তিগত অথবা কর্মক্ষেত্রের কোনো ইমোশনাল সমস্যা, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা বিষণ্নতা।
ওষুধে কাজ হয়
অনেকেই ঘুমের সমস্যার জন্য ঘুমের বড়ি খান। দীর্ঘদিন একটানা ঘুমের বড়ি খাওয়া উচিত নয়। এতে আপনি অবসন্নবোধ করবেন, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাবে এবং ধীরে ধীরে বড়ির পরিমাণ না বাড়ালে আগের মতো ভালো ঘুম হবে না। ফলে আপনি বড়ির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন। তাই ঘুমের বড়ি যত কম ব্যবহার করা যায়, ততই ভালো। ঘুমের বড়ির মতো অ্যালকোহলও ঘুমের সমস্যা করে। এই দুটোকেও পরিহার করুন। ওজন কমানোর জন্য ব্যবহৃত ওষুধ, বিভিন্ন মাদকদ্রব্য যেমন-হেরোইন, কোকেইন, অ্যামফিটামিন ইত্যাদিও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। ঘুমের সমস্যা সমাধানের জন্য অনিদ্রার মূল কারণের চিকিৎসা করাতে হবে।
- একটানা দীর্ঘদিন অনিদ্রায় কাটাবেন না। নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যান এবং নির্দিষ্ট সময়ে বিছানা ছেড়ে উঠুন, আপনি ক্লান্ত থাকেন বা না থাকেন।
- শোয়ার ঘর যথেষ্ট আরামদায়ক কি-না নিশ্চিত হোন। ঘরে যেন খুব বেশি আওয়াজ, গরম বা ঠাণ্ডা না থাকে।
- বিছানা আরামদায়ক কি-না নিশ্চিত হোন। বিছানা বেশি শক্ত হলে কোমর ও কাঁধে অতিরিক্ত চাপ পড়ে, বেশি নরম হলে শরীর খুব বেশি দেবে যায়। ফলে ভালো ঘুম হয় না।
- প্রতিদিন শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়াম করুন। অনেকেই নিয়মিত ব্যায়াম না করে হঠাৎ ব্যায়াম করেন। এটা ঠিক নয়।
- চা-কফি-অ্যালকোহল পান কমিয়ে দিন। সম্ভব হলে একেবারে বন্ধ করে দিন। বিশেষ করে বিকেলের পর চা-কফি খাবেন না। এ সময় দুগ্ধজাত পানীয় খেতে পারেন।
- বেশি রাত করে খাবেন না। যতটা সম্ভব প্রথম রাতের দিকেই খাবার সেরে নিন। রাতে অতিরিক্ত পরিমাণ খাবেন না।
- রাতে ঘুম ভালো না হলে তা পুষিয়ে নেয়ার জন্য পরদিন দিনে ঘুমাতে ইচ্ছা করতে পারে। এটা করবেন না। তাহলে আবার রাতে ঘুমের সমস্যা হবে। রাতে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যান।
- ঘুমাতে যাওয়ার আগে কিছু সময় রিলাক্স মুডে থাকুন। হাল্কা বই পড়ুন, গান শুনুন।
- কোনো বিষয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকলে ঘুম আসতে চায় না। এক্ষেত্রে একটা কাগজে আপনার দুশ্চিন্তার বিষয়টি পরিষকারভাবে লিখে ফেলুন। বিষয়টি সম্পর্কে আপনি কী করতে চাচ্ছেন এবং কখন থেকে তা করবেন সপষ্ট করে লিখুন। বিষয়টি সমাধানযোগ্য না হলে এর পরিণতি কী কী তা লিখুন। কোন পরিণতি আপনার জন্য ‘মন্দের ভালো’ হবে তা লিখুন এবং সেই বিষয়ে কী করবেন, লিখে ফেলুন।এতে দুশ্চিন্তা কমবে, ঘুম হবে।
- ঘুম না এলে ‘কেন ঘুম হচ্ছে না’ শুয়ে শুয়ে ভাববেন না। বরং উঠে পড়ুন, যা করতে ভালো লাগে করুন-বই পড়ুন, টিভি দেখুন, হালকা গান শুনুন। কিছুক্ষণ পর ঘুম আসার মতো যথেষ্ট ক্লান্তি বোধ করলে বিছানায় যান।
- ওপরের সব টিপস চেষ্টা করার পরেও যদি ঘুম না হয় তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। তিনি অনিদ্রার শারীরিক ও মানসিক কারণ নির্ণয় করে যথাযথ ব্যবস্থা দেবেন।
লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট
চেম্বারঃ সুখী মন, হাতিরপুল, ঢাকা
চেম্বারঃ সুখী মন, হাতিরপুল, ঢাকা
No comments:
Post a Comment