Tuesday, May 21, 2013

ঘুম

ঘুম আমাদের জীবনেরই অংশ। সজাগ থাকার পর ঘুম আসবে এটাই নিয়ম। মাঝেমধ্যে ঘুমে ব্যাঘাত সবারই হয়। বিশেষ করে দুশ্চিন্তা বা মনোকষ্টের কারণে কয়েক দিন ঘুম না হওয়ার পর আবার সব স্বাভাবিক হয়ে যায়। আমরা স্বাভাবিক ঘুমে ফিরে যাই। কিন্তু কখনো যদি ঘুম না হওয়ার ব্যাপারটি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তাহলে আমরা মুষড়ে পড়ি, ডাক্তারের কাছে দৌড়াই। মজার ব্যাপার হচ্ছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঘুম না হওয়ার কারণগুলো খুব সাধারণ এবং প্রতিকারযোগ্য।

ঘুমের রকমফের
রাতের বিভিন্ন সময় আমরা বিভিন্ন ধরনের ঘুম ঘুমিয়ে থাকি। সেগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধরন হলো দ্রুত চক্ষু সঞ্চালন ঘুম। এ ধরনের ঘুম এই আসে, এই যায়। আমাদের মোট ঘুমের এক-পঞ্চমাংশ এ ধরনের ঘুম। এই ঘুমের সময় আমাদের মস্তিষক খুব সচল থাকে, চোখ দুটি এপাশ-ওপাশ দ্রুত সঞ্চালিত হয় এবং আমরা স্বপ্ন দেখি।
ঘুমের বাকি চার-পঞ্চমাংশ দ্রুত চক্ষু সঞ্চালনবিহীন ঘুম। এই ঘুমের সময় আমাদের মস্তিষক থাকে খুব নিথর। এ সময় বিভিন্ন হরমোন নিঃসৃত হয়ে তা রক্তে মেশে। সারাদিনের কাজে ক্ষয়প্রাপ্ত শরীরের বিভিন্ন অংশ সারিয়ে তোলে এসব হরমোন।


কতটুকু ঘুম দরকার
আমরা কতটুকু ঘুমাব তা মূলত নির্ভর করে আমাদের বয়স ও পরিশ্রমের মাত্রার ওপর। কচি বাচ্চারা দিনে প্রায় ১৭ ঘণ্টা ঘুমায়। কিন্তু একটু বড় বাচ্চারা রাতে ৯-১০ ঘণ্টা ঘুমায়। রাতে ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানোই প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য যথেষ্ট। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমের প্রয়োজন কিছুটা কমে যায়। তাছাড়া দিনের বেলায় ঘুমালে রাতে ঘুম আসবে না-এটাই স্বাভাবিক।
ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে ঘুমের পরিমাণে বেশ তফাত দেখা যায়। কেউ কেউ রাতে মাত্র ৩ ঘণ্টা ঘুমিয়েই চলতে পারে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তা পারে না। পরপর কয়েক দিন না ঘুমালে অধিকাংশ মানুষই সারাক্ষণ ঘুম ঘুম বোধ করে, কোনো কিছুতে মনোযোগ দিতে পারে না।
ঘুম না হলে আপনি কষ্ট পাবেন-এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু মাঝেমধ্যে দু-এক রাত ঘুম না এলে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। মাঝে দু-এক রাত ঘুম না হলে তা আমাদের শারীরিক বা মানসিক স্বাস্থ্যের খুব বড় ক্ষতি করে না। তবে যে কোনো কারণে লাগাতার বেশ কিছুদিন ঘুম না হলে সারাক্ষণ ঘুম ঘুম লাগে এবং কোনো কিছুতে মনোযোগ দেয়া যায় না, সিদ্ধান্তহীনতা দেখা দেয় আর বিষণ্নবোধ হয়। এ সময় গাড়ি চালানো বা ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করা খুব বড় বিপদের কারণ হতে পারে। গাড়ি চালানোর সময় ক্ষণিকের জন্য ড্রাইভারের ঘুমিয়ে পড়াটা অনেক সড়ক দুর্ঘটনার কারণ।


অনিদ্রা
যাদের ঘুম সমস্যা আছে, তারা প্রায়ই অভিযোগ করে, তাদের যথেষ্ট ঘুম হচ্ছে না বা ঘুমিয়ে তৃপ্তি হচ্ছে না, যদিও সময় হিসাব করলে দেখা যাবে, ঘণ্টার হিসাবে তারা বেশ অনেকক্ষণ ঘুমাচ্ছেন। তবুও এই অভিযোগের কারণ, ঘুম ভেঙে ভেঙে যাওয়া। ঘুমের মধ্যে জেগে যাওয়ার অল্প সময়টুকু অনেক লম্বা মনে হয়। প্রতিদিন অনেক সাধারণ বিষয় আমাদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে যেমন-হয়তো শোয়ার ঘরটায় আওয়াজ বেশি, ঘরের তাপমাত্রা বেশি অথবা কম, বিছানা আরামদায়ক নয়, ঘুমের জন্য নির্দিষ্ট রুটিন মানা হচ্ছে না বা যথেষ্ট শারীরিক পরিশ্রম করা হচ্ছে না। রাতে খুব বেশি খেলে ঘুম আসতে চায় না আবার পেটে বেশি ক্ষুধা থাকলে ঘুম ভেঙে যায়। সিগারেট, অ্যালকোহল এবং ক্যাফিনযুক্ত খাবার যেমন-চা, কফি ইত্যাদি ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। শরীরের কোথাও ব্যথা বা গায়ে জ্বর থাকলেও ঘুম ঠিকমতো হয় না। তবে যদি দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের সমস্যা চলতেই থাকে তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। কারণ তা অধিকাংশ সময়ই মারাত্মক কিছুর ইঙ্গিত দেয়-হতে পারে তা ব্যক্তিগত অথবা কর্মক্ষেত্রের কোনো ইমোশনাল সমস্যা, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা বিষণ্নতা।


ওষুধে কাজ হয়
অনেকেই ঘুমের সমস্যার জন্য ঘুমের বড়ি খান। দীর্ঘদিন একটানা ঘুমের বড়ি খাওয়া উচিত নয়। এতে আপনি অবসন্নবোধ করবেন, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাবে এবং ধীরে ধীরে বড়ির পরিমাণ না বাড়ালে আগের মতো ভালো ঘুম হবে না। ফলে আপনি বড়ির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন। তাই ঘুমের বড়ি যত কম ব্যবহার করা যায়, ততই ভালো। ঘুমের বড়ির মতো অ্যালকোহলও ঘুমের সমস্যা করে। এই দুটোকেও পরিহার করুন। ওজন কমানোর জন্য ব্যবহৃত ওষুধ, বিভিন্ন মাদকদ্রব্য যেমন-হেরোইন, কোকেইন, অ্যামফিটামিন ইত্যাদিও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। ঘুমের সমস্যা সমাধানের জন্য অনিদ্রার মূল কারণের চিকিৎসা করাতে হবে।

ঘুমের সমস্যা সমাধানের জন্য কিছু সহজ টিপস দেয়া হলো। ঘুমের সাধারণ সমস্যা সমাধানে এগুলো খুবই কার্যকর
  • একটানা দীর্ঘদিন অনিদ্রায় কাটাবেন না। নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যান এবং নির্দিষ্ট সময়ে বিছানা ছেড়ে উঠুন, আপনি ক্লান্ত থাকেন বা না থাকেন।
  • শোয়ার ঘর যথেষ্ট আরামদায়ক কি-না নিশ্চিত হোন। ঘরে যেন খুব বেশি আওয়াজ, গরম বা ঠাণ্ডা না থাকে।
  • বিছানা আরামদায়ক কি-না নিশ্চিত হোন। বিছানা বেশি শক্ত হলে কোমর ও কাঁধে অতিরিক্ত চাপ পড়ে, বেশি নরম হলে শরীর খুব বেশি দেবে যায়। ফলে ভালো ঘুম হয় না।
  • প্রতিদিন শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়াম করুন। অনেকেই নিয়মিত ব্যায়াম না করে হঠাৎ ব্যায়াম করেন। এটা ঠিক নয়।
  • চা-কফি-অ্যালকোহল পান কমিয়ে দিন। সম্ভব হলে একেবারে বন্ধ করে দিন। বিশেষ করে বিকেলের পর চা-কফি খাবেন না। এ সময় দুগ্ধজাত পানীয় খেতে পারেন।
  • বেশি রাত করে খাবেন না। যতটা সম্ভব প্রথম রাতের দিকেই খাবার সেরে নিন। রাতে অতিরিক্ত পরিমাণ খাবেন না।
  • রাতে ঘুম ভালো না হলে তা পুষিয়ে নেয়ার জন্য পরদিন দিনে ঘুমাতে ইচ্ছা করতে পারে। এটা করবেন না। তাহলে আবার রাতে ঘুমের সমস্যা হবে। রাতে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যান।
  • ঘুমাতে যাওয়ার আগে কিছু সময় রিলাক্স মুডে থাকুন। হাল্কা বই পড়ুন, গান শুনুন।
  • কোনো বিষয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকলে ঘুম আসতে চায় না। এক্ষেত্রে একটা কাগজে আপনার দুশ্চিন্তার বিষয়টি পরিষকারভাবে লিখে ফেলুন। বিষয়টি সম্পর্কে আপনি কী করতে চাচ্ছেন এবং কখন থেকে তা করবেন সপষ্ট করে লিখুন। বিষয়টি সমাধানযোগ্য না হলে এর পরিণতি কী কী তা লিখুন। কোন পরিণতি আপনার জন্য ‘মন্দের ভালো’ হবে তা লিখুন এবং সেই বিষয়ে কী করবেন, লিখে ফেলুন।এতে দুশ্চিন্তা কমবে, ঘুম হবে।
  • ঘুম না এলে ‘কেন ঘুম হচ্ছে না’ শুয়ে শুয়ে ভাববেন না। বরং উঠে পড়ুন, যা করতে ভালো লাগে করুন-বই পড়ুন, টিভি দেখুন, হালকা গান শুনুন। কিছুক্ষণ পর ঘুম আসার মতো যথেষ্ট ক্লান্তি বোধ করলে বিছানায় যান।
  • ওপরের সব টিপস চেষ্টা করার পরেও যদি ঘুম না হয় তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। তিনি অনিদ্রার শারীরিক ও মানসিক কারণ  নির্ণয় করে যথাযথ ব্যবস্থা দেবেন।

লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট
চেম্বারঃ সুখী মন, হাতিরপুল, ঢাকা

Monday, March 11, 2013

ফলের ঔষধি গুণ

ফলের ঔষধি গুণ 

কাঁচা মরিচ


আমাদের প্রতিদিনের খাবার তৈরিতে একটি অপরিহার্য উপাদান হচ্ছে মরিচ। ঝাঁঝ আর ঝালের কারণে খাবারের স্বাদ বাড়াতে আমরা মরিচের ব্যবহার করি। ছোট সবুজ এই কাঁচা মরিচ ভিটামিন সি’র বড় উৎস ।
কাঁচা মরিচ একটি কার্যকর এন্টি-অক্সিডেন্ট। যা শরীরের বিভিন্ন প্রয়োজনে অত্যন্ত জরুরি
ক্যান্সার নিরাময় ও মানসিক অবসাদ কমাতেও মরিচের ভূমিকা রয়েছে
ত্বকের ক্ষত সারানো, রক্তনালী ও তরুণাস্থি গঠনে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ কাঁচা মরিচ প্রয়োজনীয়
এছাড়াও বর্তমানে আমরা বাড়তি মেদ নিয়ে অনেক বেশি চিন্তিত এবং সচেতন। জানেন কি মরিচে চর্বির পরিমাণ থাকে শূন্য শতাংশ? জিমে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যায়াম না করেও শুধুমাত্র কাঁচা মরিচ খেয়ে আমরা শরীরের অতিরিক্ত ফ্যাট কামাতে পারি। কাঁচা মরিচ শুধু খাবারের স্বাদ বাড়ায়না এটি আমাদের শরীরের জন্য অনেক উপকারী। খাওয়ার সময় মরিচের ঝাল স্বাদের কারণে আমদের প্রচুর ঘাম হয়, আর এটি আমাদের জমানো ক্যালোরি পোড়াতে সাহায্য করে।
ঝালের কারণে একে দূরে সরিয়ে রাখবেন না।প্রতিদিন আমাদের খাদ্য তালিকায় অন্তত ১টি কাঁচা মরিচ সঙ্গী হতেই পারে।



খেজুর


রমজানে ইফতার করা, মুমিন মুসলিমদের জন্য আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত। সারাদিন রোজা রাখার পর আমরা খেজুর খেয়ে ইফতার শুরু করি। খেজুর খেয়ে ইফতার করা সুন্নত। তাই রমজানে খেজুরের কদর বেড়ে যায়। খেজুর না থাকলে আমাদের ইফতার যেন পরিপূর্ণ হয়না। কিন্তু কী আছে এই খেজুরে, আমরা কেন এতো গুরুত্বের সঙ্গে খেজুর খাই?
আমরা হয়তো অনেকেই জানি মিষ্টি মধুর ছোট এই ফলটির গুণের কথা। আর যারা না জেনেই খেজুর খাই আজ জেনে নেই।
বলা হয়ে থাকে বছরে যতোগুলো দিন আছে, খেজুরে তার চেয়েও বেশি গুন রয়েছে। খেজুর যেমনি সুস্বাদু তেমনি পুষ্টিকর ফল।
এমিনো এসিড, প্রচুর শক্তি, শর্করা ভিটামিন, মিনারেল সমৃদ্ধ খেজুর খেলে:
  • খাদ্যশক্তি থাকায় দুর্বলতা দূর হয়
  • খেজুর স্নায়ুবিক শক্তি বৃদ্ধি করে
  • রোজায় অনেকক্ষন খালি পেটে থাকা হয় বলে দেহের প্রচুর গ্লুকোজের দরকার হয়
  • খেজুরে অনেক গ্লুকোজ থাকায় এ ঘাটতি পূরণ হয়
  • হৃদরোগীদের জন্যও খেজুর বেশ উপকারী
  • খেজুরের প্রচুর খাদ্য উপাদান রয়েছে
  • খেজুর রক্ত উৎপাদনকারী
  • হজমশক্তি বর্ধক, যকৃৎ ও পাকস্থলীর শক্তিবর্ধক
  • রুচি বাড়ায়
  • ত্বক ভালো রাখে
  • দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি করে
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়
  • খেজুরের আঁশ কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে
  • পক্ষঘাত এবং সব ধরনের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অবশকারী রোগের জন্য উপকারী
  • ফুসফুসের সুরক্ষার পাশাপাশি মুখগহ্বরের ক্যান্সার রোধ করে
  • অন্তঃসত্ত্বা নারীর সন্তান জন্মের সময় খেজুর খেলে জরায়ুর মাংসপেশির দ্রুত সংকোচন-প্রসারণ ঘটিয়ে, প্রসব হতে সাহায্য করে
  • এছাড়াও এ ফল প্রসব-পরবর্তী কোষ্ঠকাঠিন্য ও রক্তক্ষরণ কমিয়ে দেয়।
যে কোনো ফলের চেয়ে খেজুরের পুষ্টিগুণ বেশি। শুধু রমজান মাসের জন্য নয় সারা বছর পরিবারের সবার জন্য প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় আমরা এই ফলটিকে রাখতে পারি।


পেয়ারা
* পেয়ারা পাতা ও অপরিপক্ব পেয়ারা কলেরা, আমাশয় নিরাময়ে ভালো কাজ করে।
* ত্বকের ক্ষত বা ঘায়ে পেয়ারা পাতা থেঁতো করে প্রলেপ দিলে উপকার পাবেন।
* কচি পেয়ারা পাতা চিবালে দাঁতের ব্যথা কমে।
* মাড়ি ফোলা বা দাঁতের ব্যথায় প্রতিদিন সকালে পেয়ারার ডাল দিয়ে দাঁত মাজলে মাড়ি ফোলা কমবে, ব্যথাও থাকবে না।

বরই
* বরই পাতা পিষে খেলে বাতের ব্যথায় উপকার পাওয়া যায়।
* বরই রক্ত পরিষ্কার এবং হজমে সহায়তা করে।
* শুকনো বরই গুঁড়া ও আখের গুড় মিশিয়ে খেলে ইউরিন ইনফেকশন থাকবে না।

কলা
* পাকা কলা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।
* কলার থোড় বা মোচা রান্না করে খেলে ডায়াবেটিস, আমাশয় ও আলসার নিরাময় হয়।
* পাকা বিচিকলার বীজ কৃমিনাশক।

আনারস
* পাকা আনারসের জুস নিয়মিত খেলে জন্ডিস ভালো হয়।
* কচি আনারসের শ্বাস ও পাতার রস মধু মিশিয়ে খেলে কৃমি মরে যায়।

কামরাঙ্গা
* পাকা কামরাঙ্গা রক্তক্ষরণ বন্ধ করে।
* কাঁচা ফল ও পাতা সিদ্ধ করে পানি পান করলে বমি বন্ধ হয়।
* কামরাঙ্গা গাছের ডগা ও পাতার গুঁড়া খালি পেটে খেলে জলবসন্ত ও কৃমি নিরাময় হয়।
* কাশি ও অ্যাজমা নিরাময়ে পোড়া কামরাঙ্গা উপকারী।

লেবু
* লেবুর রস, আদা ও লবণ মিশিয়ে খেলে ঠাণ্ডা ও সর্দি-কাশি উপশম হয়।
* লেবুর রস ও মধু মিশিয়ে খেলে যেকোনো ক্ষত শুকায়।
* লেবুর রস ও মধু মিশিয়ে ত্বকে লাগালে রোদে পোড়া কালো দাগ থাকবে না।

চালতা
* কচি চালতার রস পেটের গ্যাস দূর করে। বাতের ব্যথায়ও উপকারী।
* কাঁচা চালতার রস ও আখের গুড় মিশিয়ে খেলে কফ দূর হয়, শ্বাসকষ্ট কমে যায়।
* পাকা চালতার রস চিনিসহ পান করলে সর্দিজ্বর উপশম হয়।

করমচা
* পাতা সিদ্ধ করে পান করলে কালাজ্বর ভালো হয়।
হশিকড়ের রস লাগালে ত্বকের চুলকানি সেরে যায়।

বেল
* পাকা বেলের শরবত কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং হজম শক্তি বাড়ায়।
* আমাশয় নিরাময়ে আধা পাকা বেল সিদ্ধ করে খেলে বেশ উপকার হয়।
* বেল পাতার রস ও মধু মিশিয়ে খেলে চোখের ছানি কেটে যায়। স্মৃতিশক্তি বাড়ায়।

আমলকী
* আমলকী নিয়মিত খেলে হাঁপানি, কাঁশি ও জ্বর নিরাময় হয়।
* আমলকী রসের শরবত জন্ডিস, বদহজম দূর করে।
* আমলকীর বীজ চূর্ণ যকৃৎ, অজীর্ণ ও ডায়াবেটিস রোগের প্রকোপ কমায়।

খেজুর
* সকালে খালিপেটে আধাপাকা খেজুরের রস খেলে কৃমি চলে যায়।
* পাকা খেজুর শারীরিক দুর্বলতা কমায়, স্নায়বিক শক্তি বৃদ্ধি করে।
* খেজুরের বিচি চূর্ণ মাজন হিসেবে ব্যবহার করলে দাঁতের যেকোনো দাগ চলে যায়।
* শুষ্ক কাশি এবং অ্যাজমায় খেজুর বীজ চূর্ণ বেশ উপকারী।
* খেজুর গাছের কাণ্ড থেকে নির্গত আঠা ডায়রিয়া ও প্রস্রাবের জ্বালাপোড়া কমায়।

কতবেল
* পাকা কতবেল যকৃৎ ও হৃৎপিণ্ড ভালো রাখে।
* বিষাক্ত পোকামাকড় কামড়ালে ক্ষতস্থানে বেলের শাঁস প্রলেপ দিলে উপকার পাওয়া যায়।
* কচি কতবেল পাতার রস দুধ ও মিছরির সঙ্গে মিশিয়ে খেলে শিশুদের পিত্তরোগ ও পেটের অসুখ ভালো হয়।

পানিফল
* কাঁচা পানিফল তলপেটের ব্যথা কমায়।
* পানিফলের শুকনো শাঁস রুটি করে খেলে অ্যালার্জি ও হাত-পা ফোলা কমে যায়।
* বিছা কামড়ালে থেঁতলানো পানিফলের শাঁস প্রলেপ দিলে উপকার হয়।

Saturday, March 9, 2013

অ্যাসিডিটি কমানোর উপায়

অ্যাসিডিটি কমানোর উপায়
—এক গ্লাস উষ্ণ গরম পানির মধ্যে সামান্য গোলমরিচ গুঁড়ো আর অর্ধেক লেবুর রস মিশিয়ে নিয়মিত খান। এতে অ্যাসিডিটি দূর হয়ে যাবে। 
—প্রতিদিন সালাদের মধ্যে মুলা খান। মুলার ওপর বিট নুন বা গোলমরিচ গুঁড়ো ছড়িয়ে খান। 
—জায়ফলের সঙ্গে সৌঠচূর্ণ মিশিয়ে খান। এতে অ্যাসিডিটি দূর হয়ে যাবে। 
—আদা অথবা পটল গরম পানির মধ্যে ফুটিয়ে সেই পানি পান করুন। 
—যখনই দুধ পান করবেন সব সময় ঠাণ্ডা দুধ পান করুন। 
—মৌরী, আমলকী এবং গোলাপফুল সমপরিমাণে মিশিয়ে চূর্ণ তৈরি করুন। সকাল-বিকাল অর্ধেক চামচ খান। এতে অ্যাসিডিটি কমে যাবে।
—পিপলের চূর্ণ মধুর সঙ্গে মিশিয়ে খান, অ্যাসিডিটি একেবারেই দূর হয়ে যাবে

বাড়তি ওজন কীভাবে কমাবেন?

বাড়তি ওজন কীভাবে কমাবেন?
ডা. দিদারুল আহসান

স্বাস্থ্য রক্ষায় আমরা এখন অনেক সচেতন ও বিজ্ঞানমনস্ক। মেদবহুলতা বা স্থূলতা এখন তাই সামাজিক সমস্যার চেয়ে স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

মেদবহুলতা
অতিরিক্ত ওজন ও স্নেহ পদার্থের আধিক্যকে সাধারণভাবে মেদবহুলতা মনে করা হয়। এর পরিমাপ হলো বডি-মাস-ইনডেক্স বা সংক্ষেপে বিএমআই।
বিএমআই ১৮.৫ থেকে ২২.৯-এর ভেতর থাকাটা বাঞ্ছনীয় বা আদর্শ। যাদের বিএমআই ২৭.৫-এর ওপরে তারা স্থূল/মেদবহুল। পক্ষান্তরে যাদের বিএমআই ২৩-২৭.৪-এর মধ্যে তারা অতিরিক্ত ওজনদার বা ওভারওয়েট। অন্যভাবে বলা যায়, উচ্চতা অনুযায়ী আদর্শ ওজনকে ১০০ শতাংশ ধরা হলে, যাদের ওজন আদর্শ ওজনের ১০১ থেকে ১১৯ শতাংশের মধ্যে তাদের রয়েছে ‘অতিরিক্ত ওজন’ এবং যাদের ১২০ শতাংশের ওপরে তারা স্থূল। সাধারণত মানবদেহে দুই ধরনের চর্বিজাতীয় পদার্থ জমা হয়। প্রথমত, অতিরিক্ত চর্বি নিতম্ব ও ঊরুদেশে জমা হয়। একে ‘গাইনয়েড ডিস্ট্রিবিউশন’ বলে। এতে শরীরের আকৃতি অনেকটা নাশপাতির মতো হয়। এটা সাধারণত নারীদের ক্ষেত্রে ঘটে থাকে।
দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত স্নেহ পদার্থ পেটে জমা হয়, যা দেহকে আপেলের মতো আকৃতি দান করে। অর্থাত্ উদরদেশ স্ফীত হয়। একে ‘অ্যান্ড্রয়েড ডিস্ট্রিবিউশন’ বলে। এটা নারী-পুরুষ উভয়ের মাঝেই দেখা যায় এবং এ ধরনের স্নেহ পদার্থের সঞ্চয় রোগের ঝুঁকি বহন করে।

রোগের কারণ
মেদবহুলতার নানা কারণের মধ্যে প্রথমেই আসে আচরণগত ব্যাপার। সমীক্ষায় দেখা গেছে, মেদবহুল লোকেরা চিরাচরিতভাবেই (ক্যালরি খরচের তুলনায়) কম খাদ্য গ্রহণের কথা বলে থাকেন। এটা হতে পারে ছোটখাটো দু-একটি খাবার, যা ঘন ঘন খাওয়া হয়, অথচ আমল দেয়া হয় না। কিছু হরমোনসংক্রান্ত ব্যক্তি বা এন্ডোক্রাইন ডিজিজ। যেমন : ঈঁংযরহম্থং উরংবধংব, চড়ষুপুংঃরপ ঙাধত্ু ঝুহফত্ড়সব ইত্যাদিও মেদবহুলতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিছু কিছু ওষুধও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ওজন বাড়ায়, যেমন—ক্লোরপ্রোমাজিন জাতীয় ওষুধ (মাথা ঘোরানো বা বমির জন্য), এমিট্রিপটিলিন (দুশ্চিন্তা দূরকারক), ভ্যালপ্রোয়েট, কার্বামাজেপিন ইত্যাদি। গবেষণায় দেখা গেছে, তিনটি বিষয় ভবিষ্যতে ওজন বৃদ্ধির আশঙ্কাকে বাড়িয়ে তোলে।
প্রথমত, বিপাকক্রিয়া কম হওয়া। দ্বিতীয়ত, উচ্চ শ্বাসনিক অনুপাত, অর্থাত্ অধিক শর্করাজাতীয় খাদ্যের বিপাক। তৃতীয়ত, ইনসুলিন হরমোন, যা ডায়াবেটিস হতে বাধা দেয়, তার কার্যক্ষমতা হ্রাস।
মেদবহুলতার সঙ্গে যেসব রোগের ঝুঁকি রয়েছে তা হলো ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ক্যান্সার, স্ট্রোক, পিত্তথলির রোগ, বাত ও চর্মরোগ, হারনিয়া, স্ট্রেস ইনকন্টিন্যান্স, বন্ধ্যত্ব, শ্বাসতন্ত্রের রোগ।
চিকিত্সকের পরামর্শে ওজন কমানোর ওষুধ খেলে ফল পাওয়া যায়। বর্তমানে অরলিস্টেট উপাদানে তৈরি এক ধরনের ওষুধ চর্বি পরিপাক ও শোষণে বাধার সৃষ্টি করে চর্বিকে রক্তে শোষিত হতে দেয় না। এর পাশাপাশি এ ওষুধ কোলস্টেরল, ট্রাইগ্লিসারাইড ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক। এছাড়াও লাইপোসাকশন ও লাইপোলাইসিস নামক সার্জারিও করা যায়। লাইপোসাকশনে নলের মাধ্যমে চর্বি গলিয়ে দেহের বাইরে আনা হয়। লাইপোলাইসিসে আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের পরিবর্তন ঘটিয়ে (লেজার থেরাপি) দেহের বাড়তি চর্বি কমিয়ে আনা যায়। এ প্রক্রিয়ায় কোনো কাটা-ছেঁড়ার প্রয়োজন হয় না এবং রক্তক্ষরণও হয় না।

লেখক : চর্ম ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ, গ্রিনলাইফ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, গ্রিন রোড, ঢাকা

পেটের যত অসুখ

পেটের যত অসুখ
অধ্যাপক ডা. মবিন খান

১৬ কোটি জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত বাংলাদেশের ৮০ ভাগ লোক গ্রামাঞ্চলে বাস করেন। যারা শহরে বাস করেন তাদেরও সিংহভাগ ভাসমান অবস্থায় চিলেকোঠায় কিংবা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকেন। তাদের অনেকের শরীরে বিভিন্ন রোগব্যাধি লেগেই থাকে। এসব রোগব্যাধির মধ্যে বেশিরভাগ লোক ভুগে থাকেন পেটের পীড়ায়। কখনও পেটের পীড়া হয়নি, ধনী কিংবা গরিব—এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশে গ্রীষ্ম ও বর্ষায় পেটের পীড়ার প্রাদুর্ভাব বেশি পরিলক্ষিত হয়।
পেটের পীড়া বলতে সাধারণভাবে আমরা বুঝি আমাশয়, ডায়রিয়া, পেটের ব্যথা কিংবা হজমের অসুবিধা। পেটের পীড়াকে প্রধানত দু’ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত, খাদ্যনালি (পাকস্থলী, অগ্ন্যাশয়, ক্ষুদ্রান্ত কিংবা বৃহদান্ত্রের রোগ)। দ্বিতীয়ত, লিভারের প্রদাহ।
খাদ্যনালিজনিত কারণে পেটের পীড়াকে দু’ভাগে ভাগ করা যেতে পারে : ১. স্বল্পমেয়াদি পেটের পীড়া, ২. দীর্ঘমেয়াদি পেটের পীড়া

স্বল্পমেয়াদি পেটের পীড়ার কারণ
১. আমাশয়, ২. রক্ত আমাশয়, ৩. ডায়রিয়া
আমাশয় : অ্যামিবিক ডিসেন্ট্রি স্বল্পমেয়াদি পেটের পীড়ার অন্যতম কারণ, যা লুক্কায়িত ঐরংঃড়ষুঃরপধ নামক জীবাণু দিয়ে সংক্রমিক হয়। এটি মূলত পানিবাহিত রোগ। যারা যেখানে-সেখানে খোলা বা বাসি খাবার খেয়ে থাকেন অথবা দূষিত পানি পান করেন, তাদের এ রোগ হয়। শহরাঞ্চলে রাস্তার ধারের খোলা খাবার খেলে এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা বেশি। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে যারা যেখানে-সেখানে মলমূত্র ত্যাগ করেন, কিংবা নদী ও পুকুরের পানি পান করেন, তাদের এ রোগে আক্রান্ত হওয়াই স্বাভাবিক।
এ রোগের উপসর্গ হঠাত্ করে দেখা দেয়। যেমন, ঘন ঘন পেটে মোচড় দিয়ে পায়খানা হওয়া। পায়খানা রক্ত বা আমমিশ্রিত থাকতে পারে। পায়খানায় বসলে উঠতে ইচ্ছে হয় না, বা উঠতে পারে না। ক্ষেত্রবিশেষে দিনে ২০-৩০ বার পর্যন্ত পায়খানা হতে পারে।
রক্ত আমাশয় : রক্ত আমাশয়ের প্রধান কারণ হলো এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া যার নাম শিগেলা। এই শিগেলাও দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। রক্ত আমাশয়ের লক্ষণ হলো তলপেটে তীব্র মোচড় দিয়ে ব্যথা হওয়া, অল্প অল্প করে বারবার পায়খানা, পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়া এবং মলদ্বারে তীব্র ব্যথা হওয়া।
ডায়রিয়া : ডায়রিয়ার অন্যতম কারণ হলো খাদ্যে নানা ধরনের পানিবাহিত ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ। শিশুদের ডায়রিয়া সাধারণ রোটাভাইরাস দিয়ে হয়ে থাকে। আর বড়দের ক্ষেত্রে নানা ধরনের ব্যাকটেরিয়া দিয়ে যে ডায়রিয়া মহামারী আকারে দেখা যায়, তার অন্যতম কারণ হলো কলেরা। আমাদের দেশে শীতকালে কলেরার প্রাদুর্ভাব বেশি হয়।
পাতলা পায়খানা হলে যদি চালধোয়া পানির মতো হয়, তবে সেটা কলেরার লক্ষণ। এর সঙ্গে তলপেটে ব্যথা হওয়া, বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া, ঘন ঘন পায়খানায় যাওয়া এবং শরীর আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে যাওয়া এ রোগের মারাত্মক উপসর্গ। এই সময়ে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া অতি জরুরি। তাছাড়া পেটের পীড়ার অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে পিত্তথলির প্রদাহ, পাকস্থলীর প্রদাহ, অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ এবং অন্ত্রের প্রদাহ।
দীর্ঘমেয়াদি পেটের পীড়ার মধ্যে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী আমাশয়। এই দীর্ঘস্থায়ী আমাশয় মূলত তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন : ১. ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম, ২. খাদ্য হজম না হওয়াজনিত পেটের পীড়া, ৩. বৃহদান্ত্রের প্রদাহজনিত পেটের পীড়া। এই অসুখগুলো মূলত ক্ষুদ্রান্ত ও বৃহদান্তের রোগ।

ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম
অল্পবয়স্ক বা উঠতিবয়স্ক যারা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছাত্রছাত্রী, কিংবা যারা নবীন চাকরিজীবী তাদের মধ্যে আইবিএস রোগটি বেশি দেখা যায়। এই রোগের লক্ষণ হলো পেটে মোচড় দিয়ে ঘন ঘন পায়খানা হওয়া, যা সকালে নাস্তার আগে ও পরে লক্ষণীয়। আইবিএস হলে অনেকের পায়খানা নরম বা অনেকের পায়খানা কঠিন হয়।
কঠিন বা নরম যাই হোক না কেন রোগীর পায়খানার সঙ্গে বাতাস যায় এবং পেটে অস্বস্তি ভাব কাজ করে। অনেকে বলেন, দুধ, পোলাও কোরমা, বিরিয়ানি খেলে এটি বেশি হয়।
খাদ্য হজম না হওয়াজনিত পেটের পীড়া
পেটের পীড়ার আরও একটি কারণ হলো গধষধনংড়ত্ঢ়ঃরড়হ ঝুহফত্ড়সব। ক্ষুদ্রান্ত্র এবং অগ্ন্যাশয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ থাকলে এ রোগটি হয়ে থাকে। প্রচুর পরিমাণে দুর্গন্ধযুক্ত সাদা পায়খানা হওয়া, পায়খানার সঙ্গে হজম না হওয়া খাদ্যকণার মিশ্রণ এবং নির্গত মল পানির ওপরে ভাসতে থাকা এ রোগের অন্যতম উপসর্গ। এর সঙ্গে পেটে মোচড় দিয়ে ব্যথা হওয়া, পেট ফুলে যাওয়া কিংবা ধীরে ধীরে শরীরের ওজন কমে যাওয়া এ রোগের লক্ষণ।

বৃহদান্ত্রের প্রদাহজনিত পেটের পীড়া
এটি একটি মারাত্মক ব্যাধি। অবশ্য আমাদের দেশে এ রোগের প্রাদুর্ভাব কম, উন্নত বিশ্বে এই রোগ বেশি হয়। এ রোগের লক্ষণ হলো আম ও রক্তমিশ্রিত পায়খানা হওয়া, জ্বর কিংবা জ্বর জ্বর ভাব হওয়া এবং শরীর আস্তে আস্তে ভেঙে যাওয়া।
সব বয়সের মানুষের এ রোগ হয়। ঈড়ষড়হড়ংপড়ঢ়ু নামক পরীক্ষার মাধ্যমে এ রোগ সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায় এবং বিশেষ চিকিত্সা পেলে এ রোগ ভালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
এছাড়া পিত্তথলির পাথর, পিত্তনালির প্রদাহ, অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ এবং পাকস্থলী ও ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রদাহের কারণে পেটের পীড়া হতে পারে। এবার সে সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করা যাক :

পিত্তথলির পাথর ও পিত্তনালির প্রদাহজনিত পেটের পীড়া
পিত্তথলির পাথর ও পিত্তনালির প্রদাহের ফলে যাদের পেটের পীড়া হয়, তাদের তীব্র পেটব্যথা হতে পারে। কয়েকদিন পরপর ব্যথা ওঠে এবং কয়েকদিন পর্যন্ত তা থাকে। ব্যথার সঙ্গে বমি ও জ্বর হতে পারে। ব্যথাটা পেটের ডান পাশে উপরিভাগে অনুভূত হয়। ব্যথা তীব্র হলে রোগী কষ্টে কাতরাতে থাকে।

অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহজনিত পেটের পীড়া
পেটের পীড়ার আরও একটি কারণ হলো অগ্নাশয়ের প্রদাহ বা Pancreatitis। অগ্ন্যাশয় একটি লম্বা অঙ্গ বা Organ, যা পেটের ভেতরে পেছনে অবস্থিত। এই অগ্ন্যাশয়ের কাজের ওপর নির্ভর করে হজমের ক্ষমতা এবং রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ ঠিক রাখা। স্বল্পমেয়াদি অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ হলে তাকে Acute Pancreatitis বলে, যার অন্যতম কারণ :
১. ভূরিভোজন, ২. পিত্তনালি বা পিত্তথলিতে পাথর এবং ৩. অ্যালকোহল পানে আসক্তি
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মৃদু বা সহনীয় ব্যথা ভালো হয়ে যায়। তবে অনেক ক্ষেত্রে চিকিত্সায় বিলম্ব কিংবা অবহেলা করলে জটিল আকার ধারণ করতে পারে, এমনকি প্রাণহানিও ঘটতে পারে।

পাকস্থলী ও ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রদাহ
ওপরের পেটে দীর্ঘদিন বারবার ব্যথা হওয়া Peptic Ulcer রোগের লক্ষণ যা পাকস্থলী (Stomach) বা ক্ষুদ্রান্ত্রের (Duodenum) প্রদাহের কারণে হয়। এই প্রদাহ দুরারোগ্য ব্যাধি। যাদের হয়, বারবার হয়। রোগীও সারে না, রোগও ছাড়ে না।
এই রোগকে পেটের পীড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বলা যায়। কেননা আমাদের দেশে ১২% লোক Peptic Ulcer-এ ভুগছেন। এছাড়া যারা অনিয়মিত খান, অতিরিক্ত ধূমপান করেন, তাদের এ রোগ বেশি হয়।
লক্ষণের মধ্যে রয়েছে, খালি পেটে ব্যথা, শেষরাতে ব্যথা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা। এ রোগ সেরেও সেরে ওঠে না। খাবারের প্রতি অনীহা, অরুচি, অস্বস্তি, ওজন কমে যাওয়া—এসব কিছুরই অন্যতম কারণ দীর্ঘমেয়াদি লিভারের প্রদাহ। এ দীর্ঘমেয়াদী লিভারের প্রদাহ এমন আকার ধারণ করে, যা কিনা দীর্ঘস্থায়ী জটিল লিভার সিরোসিসে রূপ নিতে পারে।

পেটের পীড়ার চিকিত্সা
স্বল্পমেয়াদি পেটের পীড়ায় আক্রান্ত রোগীর শরীর খুব তাড়াতাড়ি পানিশূন্য হয়ে যায়। তাই এ অবস্থা প্রতিরোধের জন্য রোগীরকে প্রচুর পরিমাণে খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে এবং প্রতিবার পাতলা পায়খানা হওয়ার পর খাবার স্যালাইন খাওয়ানো বাঞ্ছনীয়।
শরীরে জ্বর থাকলে এবং পেটে ব্যথা হলে চিকিত্সকের পরামর্শক্রমে রোগীকে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হবে।
শিশুদের ক্ষেত্রে যেহেতু ভাইরাসজনিত কারণে পেটের পীড়া বেশি হয়, তাই চিকিত্সকের পরামর্শ ছাড়া রোগীকে কোনো ধরনের ওষুধ না খাওয়ানোই শ্রেয়। তবে শিশুর শরীর যাতে পানিশূন্য না হয়, সেজন্য প্রতিবার পাতলা পায়খানা হলে শিশুকে খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে। পাশাপাশি শিশুর সব ধরনের খাবার অব্যাহত রাখতে হবে। যদি শিশু মায়ের দুধ পান করে থাকে, তবে কোনো অবস্থাতেই তা বন্ধ করা যাবে না।
দীর্ঘমেয়াদি পেটের পীড়া যেহেতু পিত্তথলির পাথর, পিত্তনালির প্রদাহ, অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ, পাকস্থলীর ও ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রদাহ, বৃহদান্ত্রের প্রদাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি লিভারের প্রদাহের কারণে হয়, তাই এসব ক্ষেত্রে চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়াই শ্রেয়। অনেকে কবিরাজি, গাছগাছড়া বা ঝাড়ফুঁকের মাধ্যমে এজাতীয় পেটের পীড়া থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করেন। এতে রোগীর ভেগান্তিই কেবল বাড়ে এবং রোগও জটিল রূপ ধারণ করে।

পেটের পীড়া প্রতিরোধে করণীয়
১. পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হলে ভীত না হয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে হবে।
২. খাদ্য গ্রহণের আগে এবং মলত্যাগের পরে নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে হবে। যেসব অভিভাবক শিশুকে খাওয়ান, তারা শিশুকে খাবার প্রদানের আগে এবং শিশুর মলত্যাগের পর একই নিয়মে হাত পরিষ্কার করবেন।
৩. পরিষ্কার পানিতে আহারের বাসনপত্র, গৃহস্থালি ও রান্নার জিনিস এবং কাপড়চোপড় ধোয়া সম্পন্ন করতে হবে এবং প্রয়োজনে সাবান ব্যবহার করতে হবে।
৪. পায়খানার জন্য সব সময় স্যানিটারি ল্যাট্রিন ব্যবহার করতে হবে। ৫. রান্নাঘর ও বাথরুমের পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা স্বাস্থ্যসম্মত রাখতে হবে।
৬. যারা গ্রামে বসবাস করেন, তাদের যেখানে-সেখানে বা পুকুর-নদীর ধারে মলত্যাগের অভ্যাস পরিহার করতে হবে।
৭. খালিপায়ে বাথরুমে বা মলত্যাগ করতে না গিয়ে স্যান্ডেল বা জুতা ব্যবহার করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
৮. খাবারের জন্য ফোটানো পানি ব্যবহার করতে হবে এবং পানি ফোটানোর ব্যবস্থা না থাকলে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ব্যবহার করতে হবে।
৯. আহারের জন্য তৈরিকৃত খাদ্যসামগ্রী এবং পান করার জন্য নির্ধারিত পানি ঢেকে রাখতে হবে।
১০. পুরনো, বাসি বা দুর্গন্ধযুক্ত খাবার কখনোই খাওয়া যাবে না।
মনে রাখবেন, পেটের পীড়া প্রতিরোধে সচেতনতাই সবচেয়ে বড় পন্থা। আপনি আপনার খাদ্যাভাস, পানিপান, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা সর্বোপরি ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে সচেতন হলে পেটের পীড়া থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন।
গলাব্যথা বা কাশি হলে
—গলাব্যথা বা কাশি হলে সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ না খেয়ে হালকা গরম পানিতে সামান্য লবণ মিশিয়ে গড়গড় করুন, চা-কফি পান করুন, তুলসীর রস খাওয়া যেতে পারে, আদার রসও খেতে পারেন।

মানসিক চাপ

মানসিক চাপ কমানোর খাদ্য

স্ট্রেস বা মানসিক চাপ শরীরের জন্য মোটেও হিতকর নয়। প্রবল মানসিক চাপ থেকে সাধারণ ঠান্ডা লাগা থেকে শুরু করে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের মতো জটিল সমস্যা পর্যন্ত হতে পারে। আর এই মানসিক চাপ, অবসাদ কমানো বা নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে নানা উপায় রয়েছে। তন্মধ্যে যথাযথ ডায়েট নির্বাচন করেও সমস্যা লাঘব করা যায়। এক্ষেত্রে রক্তের সেরোটনিন নামক কেমিক্যাল বাড়ায় এমন সব খাদ্য খাবারের মেনুতে রাখা ভালো। মনে রাখতে হবে এই সেরোটনিনই মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। এক্ষেত্রে সামান্য গরম ওয়াটমিল বেশ উপকারী এবং এ ধরনের খাবার সেরোটনিন বাড়ায়। ফলে মানসিক অবসাদ ও চাপ কমে। এছাড়া কমলা, বাঁধাকপি, কিছু কিছু মাছ রক্তের কর্টিসোল ও এডরিনালিন হরমোন কমাতে সাহায্য করে। এই হরমোনকে মানসিক চাপ বাড়ানোর ক্ষেত্রে দায়ী করা হয়। সর্বোপরি যে কোন পুষ্টিগুণ সপন্ন সুষম খাদ্য, তাজা শাক-সবজি, গাজর জাতীয় খাবার মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক। শুধু তাই নয়, এক গ্লাস গরম দুধ পান করলেও খানিকটা মানসিক চাপ কমে। গবেষণায় বিশেষজ্ঞগণ দেখেছেন দুধের বাড়তি ক্যালসিয়াম পেশীর সঙ্কোচন কমায় এবং টেনশন হ্রাসে সহায়ক। তাই গরম দুধ মানসিক চাপ কমাতে বেশ কার্যকর। এসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে সিঙ্গাপুর থেকে প্রকাশিত হেলথ ম্যাগাজিন মোজাইক-এ।



অবসাদে আমরা সবাই এক-আধ সময়ে ভুগি। জীবনযুদ্ধে নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়ে কখনও অবসাদগ্রস্ত হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে যখন এই অবসাদপূর্ণ ভাবটা এত গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী হয় যে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব হয় না, তখন এটাকে ডিপ্রেশন আখ্যা দেয়া হয়। ডিপ্রেশন একটি মানসিক রোগ। এর ঠিকমত চিকিত্সা না হলে রোগীর অবস্থার আরও অবনতি হতে পারে। চূড়ান্ত অবসাদগ্রস্ত লোক অনেক সময়ে আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়। সাধারণভাবে ডিপ্রেশনের লক্ষণগুলো হলো :
—বিমর্ষতা, উদ্যমহীনতা, সব সময়ে একটা আশাহীন ভাব।
—যেগুলো একসময় ভালো লাগত, সেগুলো আর ভালো না লাগা।
—কোনো কিছুতে মনঃসংযোগ না করতে পারা বা কোনো কিছুতে মনস্থির করতে না পারা।
—অল্প কারণেই কাঁদা ও কান্না দমন করতে না পারা।
—খিটমিটে আচরণ করা।
—নিদ্রাহীনতায় ভোগা, অথবা বেঘোরে ঘুমানো।
—পেট ব্যথা, পেট খারাপ, গায়ে ব্যথা, মাথা ধরা ইত্যাদিতে ভোগা।
—যৌনজীবনে সমস্যা।
—হঠাত্ খিদের পরিবর্তন হওয়া।
—আত্মহত্যার কথা ভাবা।
বিষাদগ্রস্ত হয়ে যাতে কেউ আত্মহত্যার পথ না বেছে নেন, সে ব্যাপারে সবার সতর্ক হতে হবে। যারা আত্মহত্যার কথা ভাবছেন, তারা অনেক সময়েই নিজের মৃত্যুর কথা বলেন; হঠাত্ অবসাদমুক্ত হয়ে চুপচাপ হয়ে যান বা খুশিখুশি ভাব দেখান। যাদের ভালোবাসেন তাদের সঙ্গে হঠাত্ গিয়ে দেখা করে আসেন। উইল প্রস্তুত করেন, দেনা-পাওনা চুকিয়ে দেন। এইসব লক্ষণ দেখলে এদের যথাসম্ভব শিগগিরই সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত।
সাধারণ ডিপ্রেশন ছাড়াও আরও কয়েকটি ডিপ্রেশনজনিত অসুখ আছে :

সাইকোটিক ডিপ্রেশন
সাইকোটিক ডিপ্রেশনে সাধারণ ডিপ্রেশনের সাধারণ লক্ষণগুলোর সঙ্গে যোগ হয় অহেতুক দুশ্চিন্তা, উত্তেজনা, চলত্শক্তিহীনতা ইত্যাদি। এই রোগে আক্রান্ত রোগীদের হ্যালুসিনেট (যা প্রকৃতপক্ষে নেই, তা দেখা বা শোনা) করতে বা ডিল্যুশনে (অযৌক্তিক ভয়ে বা চিন্তায় জর্জরিত হওয়া) ভুগতে দেখা যায়। কিন্তু রোগীদের বাস্তববোধ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অক্ষুণ্ন থাকে, যা অন্য অনেক মানসিক রোগের ক্ষেত্রে থাকে না।

ডিসথিমিয়া
ডিসথিমিয়া বা ক্রনিক ডিপ্রেশনে অবসাদের মাত্রা সাধারণ ডিপ্রেশনের থেকে কম হয়। কিন্তু এটা চলে বহুদিন পর্যন্ত। ফলে এই রোগীদের সব সময়ই অসুখী বলে মনে হয়।

সিজন্যাল এফেক্টিভ ডিসঅর্ডার (স্যাড)
স্যাড একটা বিশেষ সময়ে হয়। শীতের দেশের লোকদের শীতকালে এই ডিপ্রেশনে ভুগতে দেখা যায়। এটাকে ক্যাবিন ফিভারও অনেক সময় বলা হয়।

বাইপোলার ডিসঅর্ডার
বাইপোলার ডিসঅর্ডার বা ম্যানিক ডিপ্রেসিভ ডিজিজ হলো এক ধরনের মানসিক অসুখ, যাতে রোগীর মেজাজ একেবারে নাগরদোলায় ওঠানামা করে। একসময় এরা আনন্দের তুঙ্গে থাকেন। তখন বাড়াবাড়ি রকমের আত্মবিশ্বাস দেখানো, উত্তেজিত অবস্থায় থাকা, তাড়াতাড়ি কথা বলা, অত্যুত্সাহে ছটফট করা, আকাশছোঁয়া পরিকল্পনা ইত্যাদি করতে দেখা যায়। এই অবস্থায় অনেক সময় তাদের বাস্তববোধ (বিশেষ করে নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে) লুপ্ত হয়। অন্য সময়ে এরাই আবার অকারণেই বিষাদে নিমগ্ন হয়ে যান। তখন ডিপ্রেশনের সাধারণ লক্ষণগুলো প্রকট হয়ে ওঠে।
সাধারণ ডিপ্রেশন নানা কারণে হতে পারে। বংশানুক্রমে ডিপ্রেশন সংক্রমিত হয় বলে অনেকের বিশ্বাস। প্রিয়জনের মৃত্যুতে, পারিবারিক নির্যাতনের ফলে, জীবনের কোনো বিশেষ ঘটনায় (ডিভোর্স, চাকরি যাওয়া, বেকারত্ব, দুরারোগ্য কোনো ব্যাধি, চাকরি থেকে অবসরগ্রহণ ইত্যাদি) এবং বিশেষ কোনো ওষুধ খেলেও এই ডিপ্রেশন দেখা দিতে পারে।
ডিপ্রেশনে কেউ ভুগছেন মনে করলে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত। ডাক্তার রোগীর সঙ্গে কথা বলে ও পরীক্ষা করে বুঝতে পারবেন, ডিপ্রেশন কোন বাহ্যিক কারণে (ওষুধ, পারিপার্শ্বিক অবস্থা, ইত্যাদি) হয়েছে। তা না হলে ডাক্তার রোগীকে হয় সাইকিয়াট্রিস্ট অথবা সাইকোলজিস্টের কাছে পাঠাবেন। চিকিত্সা নানা ধরনের হয়। অ্যান্টিডিপ্রেশ্যান্ট ওষুধ দেয়া বা সাইকোথেরাপি (কথাবার্তার সাহায্যে মনোবিদরা এই চিকিত্সা করেন) অথবা দুই-ই। ক্ষেত্রবিশেষে ইলেক্টরোকনভালসিভ থেরাপিও (খুব অল্প সময়ের জন্য ইলেকট্রিক শক দিয়ে শরীরকে কব্জা করা) করতে হতে পারে। সাইকোটিক ডিপ্রেশন সারাতে বেশ কিছুদিনের জন্য হাসপাতালে গিয়ে থাকার প্রয়োজন হতে পারে। এর চিকিত্সা সময়সাপেক্ষ। সাধারণত অ্যান্টিডিপ্রেশ্যান্ট ও অ্যান্টিসাইকোটিভ ওষুধ ব্যবহার করে ডাক্তাররা এই চিকিত্সা করেন। ডিসমিথিয়া সাধারণত সাইকোথেরাপিতেই সারে।
বাইপোলার ডিসঅর্ডার যাদের ঘন ঘন হয়, তাদের চিকিত্সা খুবই কঠিন। সাধারণভাবে এর চিকিত্সা জীবনব্যাপীই করা দরকার। ওষুধই এর একমাত্র চিকিত্সা। তবে সাইকোথেরাপিও অনেক সময় করা হয়। লিথিয়ামযুক্ত ওষুধ মেজাজ বা মুডকে সংযত রাখতে সাহায্য করে। তাই লিথিয়ামযুক্ত ওষুধ এই অসুখে ডাক্তাররা দেন। একইসঙ্গে অ্যান্টিডিপ্রেশ্যান্ট। এছাড়া নতুন ওষুধ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে।






কান,চোখ,ঘাড় প্রাথমিক চিকিৎসা

কান
আহত ব্যক্তিকে    দেওয়ার সময় খেয়াল রাখবেন তার আঘাত কতটুকু। দ্রুত ডাক্তারের কাছে নেওয়া প্রয়োজন কি না
জালাল আহমেদ

কানে তালা
যা করবেন
ঠাণ্ডা লেগে, কানে পানি ঢুকে বা প্রচণ্ড শব্দ এবং বিমানে ওঠানামা করলে কানে তালা ধরতে পারে। এর প্রতিটি চিকিৎসা পদ্ধতি ভিন্ন। প্রথমে কানে তুলা গুঁজে রাখুন। শব্দ থেকে দূরে থাকুন। নাক-মুখ বন্ধ করে বারবার ঢোক গিলুন।
চিকিৎসা
শর্ষের তেলে রসুন ও আদার রস সমপরিমাণে মিশিয়ে সামান্য গরম করে ঠাণ্ডা হলে দিনে ২ বার ১ ফোঁটা করে কানে দেবেন। শর্ষের তেলের সঙ্গে ১ চিমটি কর্পূর ও ধুতরাপাতার রস ১ চা চামচ মিশিয়ে ১ ফোঁটা করে দিনে ২ বার লাগতে পারেন। তারপিন তেল ও শর্ষের তেল সমপরিমাণে মিশিয়ে সামান্য গরম করে দিনে ২ বার ১ ফোঁটা করে দিন। আধা গ্রাম সমুদ্র ফেন চূর্ণ তারপিন তেলে মিশিয়ে গরম করে ২ বার ১ ফোঁটা করে দিলে উপকার হয়।
কানে পানি ঢোকা
যা করবেন
একটু ধৈর্য ধরলে পানি বাষ্প হয়ে এমনিতে বার হয়ে যায়। ধৈর্য ধরতে না পারলে কানের ভেতরে ১ ফোঁটা পানি দিয়ে মাথা ঝাঁকালে উপকার পাবেন, যদি কান খোলা থাকে। এ ছাড়া হাতের কাছে রেকটিফায়েড স্পিরিট, ওডিকোলন বা আফটার শেভ লোশন থাকলে তার কয়েক ফোঁটা কানে দিন। এগুলো কানের পানি শুষে নেবে।
চিকিৎসা
দেবদারু ও আদার রস সমপরিমাণে মিশিয়ে ১ চিমটি কর্পূরসহ সামান্য গরম করে কানে ১ ফোঁটা করে দিনে ২ বার দিন। এক কোয়া রসুন থেঁতো করে তার রস শর্ষে তেলের সঙ্গে মিশিয়ে গরম করে ১ ফোঁটা করে দিনে ২ বার দিলে উপকার পাবেন। এ ছাড়া তুলসীপাতার রস ১ ফোঁটা করে দিনে ২ বার দিলেও ভালো হয়।
লেখক : আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক                                                                                                                                                       






  চোখে আঘাত
যা করবেন
প্রথমে এক টুকরো বরফ নরম সুতি কাপড়ে পেঁচিয়ে আঘাতের জায়গায় লাগাবেন। কিংবা ঠাণ্ডা পানি দেবেন। রোদচশমা ব্যবহার করবেন। চোখ লাল হয়ে গেলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডাক্তার দেখাবেন।
চিকিৎসা
* চা বানানোর পর যে পাতা থাকবে তা গরম অবস্থাতেই কাপড়ে পেঁচিয়ে ব্যথার জায়গায় লাগাবেন। ব্যথা ও ফুলে যাওয়া দ্রুত কমবে।
* কনকধুতরো ২টা বেটে সামান্য গরম করে লাগালে উপকার পাবেন।
চোখ ওঠা
যা করবেন
চোখ রগড়াবেন না। পরিষ্কার গরম পানিতে তুলা বা গজ ভিজিয়ে চোখ পরিষ্কার করবেন। হালকা গরম সেক দিন। রোদচশমা ব্যবহার করুন। চোখকে বিশ্রাম দিন।
চিকিৎসা
* গোলাপজলের সঙ্গে হরিদ্রা চূর্ণ শিশিয়ে ভালোভাবে ছেঁকে নিয়ে দিনে ২ ফোঁটা করে চোখে লাগালে উপকার পাবেন।
* গোলাপজলের সঙ্গে লোধছাল ও সমুদ্রফেন সমপরিমাণে মিশিয়ে ২ ফোঁটা করে দিনে ২ থেকে ৩ বার লাগালে ব্যথা ও ফোলা ভাব কমবে।
অঞ্জনি
যা করবেন
চোখে গরম পানির সেক দিন। চোখকে বিশ্রাম দিন। রোদচশমা ব্যবহার করুন। হাত দিয়ে টিপাটিপি করবেন না।
চিকিৎসা
* একটা এরন্ডপাতা বেটে নিয়ে সামান্য গরম করে লাগান।
* থানকুনি পাতা বেটে গরম করে লাগালেও উপকার পাবেন।                                                                                                                 





 কু ই ক হেলথ টিপস : মাথাব্যথা দূর করবে পানি
মাথাব্যথার অনেক কারণের মধ্যে একটি হলো পানিশূন্যতা। এক্ষেত্রে দুই গ্লাস পানি খেয়ে বিশ মিনিট বিশ্রাম নিন, দেখবেন মাথাব্যথা কমে গেছে।   




পানিতে ডোবা

পানিতে ডুবে যাওয়া ব্যক্তিকে যথাসম্ভব দ্রুত পাড়ে নিয়ে আসুন। তারপর পর্যায়ক্রমে নিচের চিকিৎসা অনুসরণ করুন :
* পানিতে ডুবে যাওয়া ব্যক্তির মুখ ও নাক পরিষ্কার করুন।
* পেট থেকে পানি বের করার জন্য উপুড় করে শোয়ান।
* শোয়ানোর জায়গাটা অবশ্যই সমতল হতে হবে। পাড়ে এনে সবুজ ঘাস আছে এমন শক্ত জায়গায় কাপড় বিছিয়ে শোয়ান।
* ডুবে যাওয়া ব্যক্তির হাত দুটি তাঁর কপালের নিচে রাখুন।
* একটি বালিশ বা কিছু কাপড় তাঁর পেটের নিচে রাখুন।
* পিঠে মৃদু চাপ দিতে থাকুন, যাতে পেটে পানি থাকলে বের হতে থাকে।



পায়ের চামড়া ওঠা বা ফোসকা পড়া
জুতার ভেতরের ঠিক যে অংশের সঙ্গে পায়ে ঘষা লাগছে, সেই অংশে নারকেল তেল দিয়ে কিছুক্ষণ পর জুতা পরুন। পায়ের ফোসকা গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে সেই পানি দিয়ে পরিষ্কার করুন। এরপর ব্যান্ডেজলাগিয়ে জুতা পরুন। বাড়ি ফিরে জুতা খোলার পর জায়গাটায় আবার পরিষ্কার করে অ্যান্টিসেপটিক মলম লাগান।

চিকিৎসা
*নারকেল তেল তুলার প্যাডে ভিজিয়ে জুতা পরার ৫-১০ মিনিট আগে চামড়া ওঠা জায়গায় তিন-চার দিন লাগান।
*নারকেল তেল এক চিমটি কর্পূরের সঙ্গে মিশিয়ে ফোসকার জায়গায় লাগান।
*রসুন থেঁতো করে কয়েক ফোঁটা নারকেল তেলের সঙ্গে মিশিয়ে লাগালে উপকার পাবেন।

নখ ওঠা
ক্ষত জায়গা পরিষ্কার করে অ্যান্টিসেপটিক মলম লাগিয়ে বেঁধে রাখুন। লাগাতে পারেন ব্যান্ড এইড। প্রয়োজনে ব্যথার ওষুধ খাবেন। নখ খুঁটবেন না। পায়ের নখের বেলায় চাপা জুতা পরবেন না।

চিকিৎসা
*পানের খয়েরের পেস্ট ক্ষত জায়গায় দিনে তিনবার লাগান।
*শ্বেতকরবী মূল বেটে গরম করে লাগালে উপকার পাবেন।
*নিমপাতা বাটা মেটে সিঁদুর ও সাদা ধুনো একসঙ্গে মিশিয়ে লাগান, ব্যথা থাকবে না।





ঘাড় ব্যথার আধুনিক চিকিত্সা
ডা. মো. শাহাদত্ হোসেন

প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড কনসালট্যান্ট
ফিজিওথেরাপি ফাউন্ডেশন

রাতে সুস্থ মানুষ শুয়ে আছেন, সকাল বেলায় আর ডান-বাম ঘাড় নাড়াতে পারছেন না। এর কারণ কি জানেন? হয়তো ঘুমের ঘোরে আপনার ঘাড়ের অবস্থান ঠিক ছিল না অথবা রোগের বহি:প্রকাশ। ঘাড় ব্যথা বিভিন্ন রোগের বহি:প্রকাশে হতে পারে। যেমন—স্পনডাইলোসিস, আথ্রাইটিস বা বাত জনিত সমস্যা, ফাইব্রোমায়েলজিয়া ডিক্স প্রলাস্প অথবা যখন ব্যথা হাতে চলে যায় নিউরাইটিস এবং নিডর্যালজিয়া।

কোথায় ব্যথা অনুভব হলে বলা
যাবে রোগীর ঘাড়ে সমস্যা?
ঘাড়ব্যথা একেকজনের একেক রকম হতে পারে। ব্যথা প্রথমত শুরু হয় ঘাড়ের নিচের অংশের যে কোনো একদিকে। হয় ডান দিকে অথবা বাম দিকে। অনেক সময় ব্যথা শুরু হয় মাঝখান থেকে। কিছুদিনের মধ্যে ব্যথা ছড়িয়ে যায় কাঁধের চারপাশে। তারপর কনুইয়ের উপরের অংশে অথবা ছড়িয়ে যেতে পারে হাতের কব্জি ও আঙুল পর্যন্ত। হাতে আঙুল ঝিনঝিন ও নাম্বনেস অনেকের হাতের বোধশক্তি কমে যায়। অনেক রোগী মনে করেন তার হাতের ওপর আরও একটি স্তর আছে। কারও কারও হাত দুর্বল হয়ে যায়। এতে ঘাড়ে ব্যথা না হয়ে কিছু ব্যথা অনুভব হতে পারে বাহু থেকে। ঘাড় ব্যথার সঙ্গে মাথার ব্যথারও সম্পর্ক আছে। এ ব্যথা মাথার একপাশে, মাথার পেছনে, কারও কারও মাথার দু’পাশে অনুভব করে। এ ব্যথাকে বলে সারভাইকো জোনিক মাথাব্যথা। ব্যথার শুরুটা রহস্যজনকভাবে কোনো কারণ ছাড়াই হতে পারে। আবার কমে যাওয়াটাই রহস্যজনকভাবে হতে পারে। তবে বেশিরভাগ রোগীর ব্যথা তার জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে।
ঘাড় ব্যথার কারণ
সারাদিনে যেসব কাজ আমরা করে থাকি তার বেশিরভাগ কাজ করা হয় সামনে ঝুঁকে বা রিলাক্সভাবে বসা অবস্থায় তখন মাথা ও ঘাড় প্রোটুটেড বা সামনে আগানো থাকে।। যদি এই অবস্থান দিনের পর দিন চলতে থাকে তাহলে ঘাড়ের অবস্থানগত পরিবর্তন হয়। এতে লিগামেন্টের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে ফলে দীর্ঘদিন বারবার মাংসপেশী যখন অতিরিক্ত চাপে থাকে তখন এদের মধ্যে একধরনের ইনজুরি ও ড্যামেজ শুরু হয়। ফলে ঘাড় ব্যথা শুরু হয়। আর এসব ঘটনার মূল কারণ হচ্ছে রোগীর দৈনন্দিন কাজের মধ্যে অবস্থানগত ত্রুটির জন্য।
রোগের কারণে স্পনডাইলোসিস, আথ্রাইটিস বা বাত জনিত সমস্যা, সারভাইক্যাল রিবস, ফাইব্রোমায়েলজিয়া ডিক্স প্রলাস্প, নিউরাইটিস নিডর্যালজিয়া।

কাঠামোগত কারণ
—ভুলভাবে দীর্ঘসময় বসা অবস্থায় থাকার কারণে বিশ্রাম ও বিছানায় শোয়ার কারণে।
—সঠিক বিছানা সঠিক বালিশ না ব্যবহার করার জন্য কঠিন বা পরিশ্রমের কাজ করার পরে হঠাত্ রিলাক্সে যাওয়ার কারণে বিসদৃশভাবে কাজ করলে।
—চেয়ার টেবিল বা কম্পিউটার উচ্চতা সঠিক না হলে
বসার ভঙ্গিমা ঠিকমত না হলে এবং ডেস্কে কাজ করার অবস্থাগত পদ্ধতি ভুল হলে কোমর, ঘাড় ও মেরুদণ্ডে ব্যথা সৃষ্টি হয়।
ঘাড় ব্যথায় ম্যানুয়াল থেরাপি
ফিজিওথেরাপি চিকিত্সা : গবেষণা করে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ঘাড় ব্যথা রোগী ফিজিওথেরাপি নিয়ে ভালো আছে। তবে বুঝতে হবে কি ধরনের ফিজিওথেরাপি দরকার। ঘাড় ব্যথার সঠিক চিকিত্সা হচ্ছে ম্যানুয়াল ও ম্যানুপুলেশ থেরাপি। ম্যানুয়াল ও ম্যানুপুলেশ থেরাপি দ্বারা রোগী তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে।

যেভাবে থেরাপি কাজ করে
ম্যানুয়াল থেরাপি : প্রথমেই দরকার অবস্থানগত পরিবর্তন বা সঠিকীকরণ যে অবস্থানে রোগীর ব্যথা কম থাকে বা হাতের ব্যথা কমে ঘাড়ে আসে। একেই বলে সেন্ট্রালাইজেশন বা ব্যথা কেন্দ্রীভূতকরণ। আর রোগীকে অ্যাসেসমেন্টের মাধ্যমে পর্যালোচনা করে শুরুমাত্র একটি মুভমেন্ট নির্বাচন করতে হবে, যে মুভমেন্টটি রোগীর সমস্যাটিকে অর্থাত্ ঘাড়ের অবস্থানটাকে সঠিক করে ফলে ব্যথা কমে যায়। এভাবেই যদি রোগী ১০-১৫ দিন প্রতিদিন ৪-৫ বার করে তাহলে ব্যথা অনেকটাই কমে যাবে এবং রোগী সাধারণ কাজে ফিরে যেতে পারবে। তবে রোগীকে ব্যয়ামটি দিনে ২-৩ বার বেশ কিছুদিন করতে হবে। এ পদ্ধতির এ নাম ম্যাকেঞ্জি যা বিশ্বে বিশেষভাবে সমাদৃত।
ম্যানুপুলেশন : এই প্রক্রিয়াটিও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এ প্রক্রিয়ায় রোগীকে প্রথমে ব্যথামুক্ত পাশকে রোটেশন করে শোয়াতে হবে এবং এ অবস্থায় থ্রাস্ট বা জোড়ে চাপ দিতে হবে, যাতে ঘাড়ের অবস্থান সঠিক জায়গায় এসে পড়ে। ফলে ব্যথা সঙ্গে সঙ্গে চলে যায়।








হার্ট এ্যাটাক

উপসর্গহীন হার্ট এ্যাটাক

হার্ট এট্যাক তথা এমআই (Myocardial Infraction) সাধারণত বেশ কিছু উপসর্গসহ দেখা দেয়। যার মধ্যে প্রধানত রয়েছে বুকে ব্যথা হওয়া, বুকে চাপ লাগা, অস্থিরতা বোধ করা, হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেলা। বুকের ব্যথা কখনো কখনো বাম ঘাড়ের দিকে বা বাম চোয়ালে যেতে পারে, শুধু তাই না, বাম বাহুর ভিতরের দিকেও ব্যথা ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এসব উপসর্গ দেখে আমরা দ্রুত বুঝে যাই কারো এম আই হলে, এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করি। আর এমন অবস্থায় বাসায় বা অন্য কোথাও কোনো মানুষকে পাওয়া গেলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে, হাসপাতাল দূরে হলে এস্পিরিন ৪টা ট্যাবলেট একসাথে খাইয়ে দিতে হবে। পারলে জিহবার নিচে নাইট্রোকার্ড বা নাইট্রোসোল স্প্রে করে দিতে হবে!!

সবই ঠিক আছে, কিন্তু যদি এমন কিছু হয় যখন হার্ট এট্যাকের কিছুই রোগী বুঝতে পারবে না, কিন্তু হার্ট এট্যাক হয়ে হঠাৎ খুব খারাপ অবস্থা হয়ে যেতে পারে এমনকি জীবনাবসানও ঘটে যেতে পারে!

এমনটা হওয়া অসম্ভব নয়! এমন অবস্থা হওয়াকেই বলে সাইলেন্ট এমআই বা সাইলেন্ট হার্ট এট্যাক!

সাইলেন্ট কেন? কারণ রোগী এই সময় কিছু বুঝতে পারে না, আর পারলেও খুব অল্প বা সাধারণ ব্যথা হিসেবে মনে করে তেমন পাত্তা দেয় না!

সবার হতে পারে? না! সাধারণত ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রেই প্রধানত এমনটা দেখা যায়। তবে কি যেকোনো ডায়াবেটিস রোগীর এমনটা হতে পারে? না, সেটাও নয়। সাধারণত যাদের শরীরে ডায়াবেটিস এর জন্য নানা ধরনের কমপ্লিকেশান তৈরি হয়, তাদের ক্ষেত্রেই এমনটা হয়ে থাকে!

কেন হয়? ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথী হওয়ার কারণে শরীরের বোধ শক্তি অনেকটাই কমে আসে ফলে হার্ট এট্যাকের সময় তীব্র ব্যথা হলেও মানুষ সেটা বুঝতে পারে না সহজে।

চিকিৎসা-চিকিৎসার ব্যাপারে সাধারণ হার্ট এট্যাক আর সাইলেন্ট হার্ট এট্যাক এর মাঝে কোনো পার্থক্য নেই।

সচেতন থাকাটা খুবই প্রয়োজন-সাইলেন্ট এম আই থেকে দূরে থাকতে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখাটা খুব প্রয়োজনীয়।

কি করা উচিতঃ

০ ডায়াবেটিস এর কম্পলিকেশান যার শরীরে তৈরি হবে তাকে সব সময় সাবধানে থাকতে হবে।

০ নিয়মিত কোনো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বা ডায়াবেটোলোজিস্ট এর তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে।

০ বুকে অল্প ব্যথা দেখা দিলে কিংবা অস্থিরতা বোধ করতে (যেটা হাইপোগ্লাইসেমিয়া নয়) দ্রুত হাসাপাতালে যেতে হবে!

অস্থিরতা হাইপোগ্লাইসেমিয়ার জন্য নাকি সাইলেন্ট এম আই এর জন্য কিভাবে বুঝবে?

হাইপোগ্লাইসেমিয়া এর জন্য যখন অস্থিরতা হয়, তখন গ্লুকোজ বা চিনি কিংবা অন্য কোনো খাবার খেলে সেটা দ্রুতই ঠিক হয়ে আসবে কিন্তু সাইলেন্ট এম আই এর ক্ষেত্রে সেটা হবে না। আর ঘরে গ্লুকোমিটার থাকলে সহজেই এটা বোঝা যাবে!

সাইলেন্ট এম আই এর ব্যাপারে নিজে সচেতন হোন এবং অন্যকে সচেতন করুন!! -ইন্টারনেট                                                                                     






  হঠাত্ হৃিপণ্ড অচল হলে...

নানাবিধ কারণে হঠাত্ হৃিপণ্ডের কাজ বন্ধ হয়ে মানুষ সংজ্ঞাহীন ্ও মৃত্যুমুখে পতিত হয়। ভেন্টিকুলার কনট্রাকশন বা নিলয়ের সংকোচন চাপ কিছু সময়ের জন্য যদি বন্ধ হয়ে যায় অথবা অত্যন্ত দু্রতভাবে কাজ করে তবে দেহের রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হতে পারে । ৫-৭ মিনিটের মধ্যেই চিকিত্সা শুরু না হলে রোগীর মৃত্যু ঘটতে পারে। কারণ মস্তিষ্কের কোষকলায় অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছাতে না পেরে কোষকলা নষ্ট হয়ে যায়।
িকিত্সা ও করণীয়
—খুবই জরুরিভাবে হাসপাতালে পৌঁছাতে হবে, ৩-৫ মিনিটের মধ্যে।
—রোগীর হৃিপণ্ডের রক্ত চলাচলের জন্য রোগীকে শক্ত বিছানায় শুইয়ে পা দুটি বিছানা থেকে একটু ওপরে রাখতে হবে।
—বুকের বাম পাঁজরের কাছে দুই হাত একত্রিত করে অর্থাত্ হৃিপণ্ড বরাবর চাপ দিতে হবে যেন চাপের সঙ্গে বুকের বাতা (জরন) ওঠানামা করে।
—শ্বাসপ্রশ্বাসের অসুবিধার জন্য মুখ থেকে মুখে শ্বাসপ্রশ্বাস দিতে হবে।
—বুকে চাপ দেয়ার সময় যিনি চাপ দেবেন তার হাত ভাঁজ হওয়া চলবে না। শুধু চাপ দেয়ার মানুষটির কাঁধের নড়াচড়া দেখা যাবে। প্রতি মিনিটে ৬০-৮০ বার এভাবে দিতে হবে। একে কার্ডিয়াক ম্যাসেজ বলে।

রোজি আক্তার
চট্টগ্রাম

দাঁত

আপনার মুখে দুর্গন্ধ !

যদি আপনার মুখে দুর্গন্ধ থাকে তাহলে জানবেন শুধু আপনি একা নন, আপনার আশপাশের অনেকেই এই সমস্যায় ভুগছেন। আমাদের দেশের ৮৫ ভাগ লোক কোনো না কোনোভাবে এই সমস্যার শিকার। দন্ত চিকিত্সা বিজ্ঞানের ভাষায় মুখে দুর্গন্ধ হওয়ার এই সমস্যাকে হ্যালিটোসিস বলে।

যেসব কারণে মুখে দুর্গন্ধ হতে পারে
* মুখে দুর্গন্ধ হওয়ার প্রধান কারণ হলো সঠিক পদ্ধতিতে নিয়মিত দাঁত ব্রাশ ও সঠিক পেস্ট ব্যবহার না করা।
* তীব্র গন্ধযুক্ত খাবার, যেমন—পেঁয়াজ, রসুনযুক্ত খাবার, ফাস্ট ফুড খাওয়া।
* মাড়ির সমস্যা, উঁচুনিচু বা ফাঁকা দাঁত, যেখানে খাবার জমে-পচে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে।
* দাঁতে ক্যারিজ হলে।
* ড্রাই মাউথ সিনড্রোম।
* মুখ দীর্ঘ সময় ধরে শুকনো থাকলে।
* তামাকজাতীয় দ্রব্যাদি বা জর্দা-চুনসহ পান খেলে।
* মুখের ক্যান্সারে।
* জিহ্বায় ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ।
* এ ছাড়া যদি আপনার ডায়াবেটিস, ক্রনিক সাইনুসাইটিস, ব্রংকাইটিস, নিউমোনিয়া, ক্রনিক কফ, পেপটিক আলসার বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা থাকে তাহলে আপনার মুখে দুর্গন্ধ হতে পারে।

মুখে দুর্গন্ধের কারণে দাঁতের রোগ
দীর্ঘদিন যদি আপনার মুখে দুর্গন্ধ বা হ্যালিটোসিস রোগ থাকে, তবে সেখান থেকে প্ল্যাক বা ক্যালকুলাস জমে দন্তক্ষয় হতে পারে। এছাড়া মাড়ি দুর্বল হয়ে যাওয়া বা মাড়ি থেকে রক্ত পড়ার অন্যতম কারণ হলো হ্যালিটোসিস রোগ।

প্রতিরোধের কিছু উপায়
অনেকেই হয়তো মনে করেন, বাজারে অনেক সুগন্ধি মাউথওয়াস পাওয়া যায়, যা দিয়ে কুলকুচি করলে ভালো হয়ে যাবে। এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। এগুলো শুধু দুর্গন্ধ ঢেকে রাখে, কিন্তু দন্তরোগ বা অন্যান্য সমস্যা থেকে মুক্ত করে না। এজন্য দিনে দু’বার অহঃর নধপঃবত্রধষ মাউথওয়াস দিয়ে কুলকুচি করুন।
এছাড়াও...
* সকালে ও রাতে খাবার পর দাঁত ৩-৪ মিনিট ধরে ব্রাশ করুন।
* মেডিকেটেড টুথপেস্ট যেমন সবফরঢ়ষঁং, ংধহংড়ফরহব ব্যবহার করতে পারেন।
* দিনে অন্তত একবার দাঁতে ফ্লস করুন।
* ঞড়হমঁব পষবধহবত্ বা ব্রাশ দিয়ে জিহবার ওপরের অংশ ভালো করে পরিষ্কার করুন।
* সিগারেট, তামাকজাতীয় দ্রব্য, জর্দা, পান—এসব পরিহার করুন।
* বেশি করে পানি খান।
* নন-সুগার কেমিক্যালমুক্ত পযবরিহম মঁস খেতে পারেন। এটা আপনার মুখে লালার ক্ষরণ বৃদ্ধি করে আপনার মুখ দুর্গন্ধমুক্ত রাখবে।
* এছাড়া যদি আপনার ডায়াবেটিস, ক্রনিক সাইনুসাইটিস, ব্রংকাইটিস, নিউমোনিয়া, ক্রনিক কফ, পেপটিক আলসার বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা থেকে থাকে, তাহলে সেগুলো অতি দ্রুত সমাধানের জন্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
আশা করি উপরোক্ত নিয়ম মেনে চললে এই সমস্যা থেকে দ্রুত মুক্তি পাবেন। তাহলে আর দেরি কেন? বিজ্ঞাপনের ভাষায় এখন কণ্ঠ ছাড়ুন জোরে!      


   সুন্দর হাসির পেছনে যদি লুকিয়ে থাকে হলদেটে দাঁত, ভাবুন তো একবার অবস্থাটা। আপনার সব স্মার্টনেস,পরিপাটি সাজসজ্জা নিমিষেই মাটি।
এই সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে আজকাল বাজারে পাওয়া দাঁত ঝকঝকে করার নানান জিনিসপত্র। আছে ব্যয়বহুলপদ্ধতির নানা রকম চিকিৎসার সুযোগও।
কিন্তু আপনি যদি ঘরে বসেই পেয়ে যান এর সমাধান, তবে কেমন হয়? মুক্তার মত ঝকঝকে সাদা দাঁতের জন্য তবে জেনে রাখুন কিছু সহজ সমাধান।
# মাউথওয়াশ, কফি এবং সোডা জাতীয় পানীয় থেকে দূরে থাকুন। অতিরিক্ত কফি বা সোডা জাতীয় ড্রিঙ্কস পান এবং খুব বেশি মাউথওয়াশ ব্যবহারে দাঁতে হলদে ভাব বেশি হয়। খাবার পরেই চেষ্টা করুন ভাল করে কুলি করে নিতে।
# দিনে অন্তত দুবার অবশ্যই ব্রাশ করুন। এটি দাঁতের প্লাক ও ব্যাকটেরিয়া দূর করতে সাহায্য করে।
# মাড়িতে রক্তের ভয়ে অনেকেই ফ্লসিং করতে চান না। কিন্তু সঠিক ভাবে ফ্লসিং করলে দাঁতের স্বাস্থ্য ভাল থাকে, হলদেটে ভাব দূরে রাখতে সাহায্য করে।
# দুধের তৈরি খাবার যেমন শক্ত পনির মাড়িকে সুস্থ রাখে। দাতের ঝকঝকে সাদা রঙ ধরে রাখতে সাহায্য করে।
# খাবার তালিকায় তিলের বীজ, সূর্যমুখীর বীজ রাখুন। এসব বীজ অনেক দরকারি খনিজ পদার্থ, ফাইবার, প্রোটিন ও ভিটামিনের ই এর ভাল উৎস।
এছাড়াও এতে থাকে ম্যাগনেসিয়াম। নিয়মমাফিক সূর্যমুখীর বীজ চিবালে নিঃশ্বাসের দুর্গন্ধ দুর হয়। এছাড়া তা দাঁতের প্লাক ধ্বংস করে, এবং দাঁতের এনামেল তৈরিতে সহায়তা করে। তিলের বীজেও পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম থাকে, যা দাঁতের মাড়ির চারপাসের হাড়কে ক্ষয় থেকে রক্ষা করে।
# খাবারে রাখুন পর্যাপ্ত পরিমানে শাকসবজি। দেহের আর সব কিছুর মতই দাঁতের যত্নেও এটা অন্যতম শর্ত।
# প্রতি দুই মাসে আপনার ব্রাশটি বদলে ফেলতে ভুলবেন না যেন।
# লেবু আর লবনের মিশ্রণ দিয়ে দাঁত মেজে দেখুন। আয়নার সামনে তফাৎটা নিজেই দেখতে পাবেন।
# শরীরের চাহিদা মতন পর্যাপ্ত পরিমানে ক্যালসিয়াম গ্রহন করুন।
বাচ্চারা প্রায়ই দাঁত মাজতে চায় না। এমন হলে নিয়ে আসুন তার জন্য মজাদার ফ্লেভারের পেস্ট।
দেশি-বিদেশি এসব পেস্টের মজাদার স্বাদে দেখবেন আপনার বাচ্চা সকাল-রাত দুবেলা মজা করে ব্রাশ করবেই।
# বাচ্চাকে অবশ্যই চকলেট খাবার পরে কুলি করতে শিখান। সম্ভব হলে ব্রাশ। বাচ্চাদের দাঁত প্রথমত মিষ্টি জাতীয় খাবার আর চকলেটের কারনেই নষ্ট হতে শুরু করে।
# নিজে অতিরিক্ত কোমল পানীয় খাবেন না, বাচ্চাকে তো আরও নয়। এসব ড্রিংকসের কারনে দাঁতের সাদাটে ভাব একদম নষ্ট হয়ে যায়।
# বাচ্চাকে অতিরিক্ত ঠাণ্ডা বা গরম কোন কিছুই খাওয়াবেন না। এটা দাঁতের ভীষণ ক্ষতি করে। মনে রাখবেন দাতের সমস্যা মানেই দাঁত এর সুন্দর ঝকঝকে সাদা রঙটি ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাওয়া।                                    










 দাঁত
জালাল আহমেদ 
আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক

দাঁতে পোকা
যা করবেন
দাঁতে কিন্তু সত্যি সত্যি পোকা হয় না, এটি আসলে দাঁতের ক্ষয়রোগ। যাকে বলে ডেন্টাল ক্যারিজ। এ রোগে হঠাৎ তীব্র ব্যথা হতে পারে। ব্যথানাশক ওষুধ খেতে পারেন। লবণ-পানিতে বা অ্যান্টিসেপটিক দিয়ে গার্গল করতে পারেন।
চিকিৎসা
কন্টিকারি গাছের শুকনো ফল ও কর্পূর সমপরিমাণে চূর্ণ করে ব্যবহার করলে ভালো হয়। তামাকপাতার চূর্ণ ও কর্পূর সমপরিমাণে লবঙ্গ তেলের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করুন। বিট লবণ, মরিচ চূর্ণ, সোহাগা, ফিটকিরি একত্রে লবঙ্গ তেলের সঙ্গে মিশিয়ে লাগালে আরাম পাবেন।

দাঁত দিয়ে রক্তপাত
চিকিৎসা
পেয়ারাপাতা, বাবলাপাতা পানিতে সিদ্ধ করে সেই পানি দিয়ে কুলকুচা করতে পারেন। ফিটকিরি চূর্ণ, লবঙ্গ চূর্ণ ও কর্পূর সমপরিমাণে ঠাণ্ডা পানির সঙ্গে মিশিয়ে কুলকুচা করবেন। আতাফলের বীজ ও তেঁতুল বীজ সমপরিমাণে চূর্ণ করে দাঁতের গোড়ায় লাগালে রক্তপাত বন্ধ হবে।

আক্কেল দাঁতে ব্যথা
চিকিৎসা
যবক্ষার ও বিট লবণ সমপরিমাণে মিশিয়ে লবঙ্গ তেলের সঙ্গে ব্যবহার করুন। যবক্ষার ও তুঁতে ভস্ম সমপরিমাণে ব্যবহার করলে উপকার হয়। পলাশক্ষার লবঙ্গ তেলের সঙ্গে মিশিয়ে লাগালেও উপকার পাবে

কিডনি রোগ

কিডনি রোগ সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য
আপনি জানেন কি?
—মানুষের দুটো কিডনি প্রতিদিন প্রায় ১৭০ লিটার রক্ত পরিশোধিত করে শরীরকে সুস্থ রাখে?
—দুটো কিডনিতে প্রায় ২০-২৫ লাখ ছাঁকনি রয়েছে, যা অনবরত রক্তকে পরিশোধিত করে যাচ্ছে।
—কিডনি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে রক্তস্বল্পতা দূর করতে সাহায্য করে এবং অস্থি শক্তিশালী করে থাকে।
—শরীর সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখার জন্য একটি কিডনিই যথেষ্ট।
—কিডনির প্রধান রোগ নেফ্রাইটিস বা নেফ্রোটিক সিনড্রম, যা কিডনির ছাঁকনি বা ফিলটার মেমব্রেনকে ক্ষতবিক্ষত করে। এর কারণে শরীর থেকে অত্যাবশ্যকীয় প্রোটিন বেরিয়ে যায়।
—প্রস্রাব প্রদাহ কিডনির একটি সাধারণ রোগ হলেও শিশুদের ক্ষেত্রে মারাত্মক হতে পারে।
—ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ কিডনি রোগ নয়, তবু কিডনিকে আক্রান্ত করে কিডনির কার্যকারিতা কমিয়ে মারাত্মক জটিলতার সৃষ্টি করে।
—যেসব রোগ কিডনিকে আক্রান্ত করে কিডনির কার্যকারিতা বিনষ্ট করে বা কিডনি ফেইলিয়র হয় এদের মধ্যে—১. নেফ্রাইটিস ২. ডায়াবেটিস এবং ৩. উচ্চ রক্তচাপ। সুতরাং প্রাথমিক পর্যায়ে এসব রোগের চিকিত্সায় যত্নবান হন।
—দুটো কিডনি ৯০ ভাগ অকেজো হওয়ার পরই কেবল ডায়ালাইসিস বা কিডনি সংযোজনের মতো চিকিত্সার প্রয়োজন হয়।
—জীবিত অবস্থায় আপনি আপনার একটি কিডনি কেবল বাবা-মা, ভাই-বোন, ছেলে-মেয়েকে নির্ভয়ে দান করতে পারেন। এদের ভেতর রক্তের গ্রুপ বা টিস্যু টাইপ না মিললে তখন আপন চাচা, মামা, ফুফু, খালা বা স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে কিডনি দান করতে পারেন।
—মৃত ব্যক্তি (ব্রেনডেথ-ভেন্টিলেটরে থাকা অবস্থায়), আত্মীয়-অনাত্মীয় সবাইকে কিডনি দান করতে পারে।
—আকস্মিক কিডনি বিকল রোগে তাত্ক্ষণিক চিকিত্সা অনেক রোগীকে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে।
—অতিরিক্ত ডায়রিয়া, বমি ও রক্তক্ষরণ আকস্মিক কিডনি বিকল হওয়ার প্রধান কারণ।
—মেয়েদের গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ পরবর্তী পর্যায়ে কিডনি রোগের কারণ হতে পারে।

কিছু পরামর্শ ও পরিসংখ্যানগত তথ্য
—শতকরা ৩০ থেকে ৪০ ভাগ ডায়াবেটিস রোগী কিডনি রোগে ভুগে থাকেন।
—উচ্চ রক্তচাপের কারণে ২০ থেকে ৪০ ভাগ রোগীর কিডনি অকেজো হতে পারে।
—ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখুন এবং কিডনি রোগ থেকে বাঁচুন।
—শুধু রক্তচাপ, প্রস্রাব পরীক্ষা এবং রক্তের ক্রিয়েটিনিন ও সুগার পরীক্ষা করেই জানা যায় কিডনি রোগ আছে কিনা?
—কিডনি সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে গেলে ডায়ালাইসিস অথবা কিডনি সংযোজনই হলো বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়।
—শিশুদের টনসিলাইটিস, প্রস্রাবে প্রদাহ ও চর্মরোগের তাত্ক্ষণিক চিকিত্সা করুন।
—কিডনি রোগ ছোঁয়াচে নয়, তবে বংশানুক্রমিক হতে পারে।
—আপনার বয়স যদি ৪০ বছরের ওপর হয়, আপনি যদি ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপে ভুগে থাকেন, অথবা বংশে যদি কিডনি রোগ থাকে, তবে অবশ্যই আপনার রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করে জেনে নিন, আপনার কিডনি রোগ আছে কিনা?
—সচেতন হলে স্বল্পব্যয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে কিডনি রোগ নির্ণয় ও প্রতিরোধ করা সম্ভব।
—বর্তমান ধারায় কিডনি রোগী বৃদ্ধি পেলে ২০২০ সালে বাংলাদেশে ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ ক্রনিক কিডনি রোগে আক্রান্ত হবে।
—বাংলাদেশে বর্তমানে দুই কোটি লোক কোনো না কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত।
—বাংলাদেশে প্রায় ৪০ হাজার রোগী ধীর গতিতে কিডনি অকেজো হয়ে প্রতিবছর অকালে মৃত্যুবরণ করে।
—অ্যান্টিবায়োটিক ও ব্যথানাশক ওষুধ ব্যবহার শতকরা ১৫ থেকে ২০ ভাগ কিডনি রোগের কারণ হতে পারে।
—কিডনি নষ্ট হলে ডায়ালাইসিস করে চিকিত্সা করার সামর্থ্য বাংলাদেশের শতকরা ১০ জনেরও নেই। তাই কিডনি রোগ সম্পর্কে জানুন, সতর্ক থাকুন এবং প্রতিরোধ করুন।
—নেফ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে কিডনি বিকল হওয়ার কারণ।                                                                                                                                    







 কিডনি রোগ প্রতিরোধ সম্ভব
অধ্যাপক হারুন আর রশিদ

সভাপতি,
কিডনি ফাউন্ডেশন ও
সোসাইটি অব অরগান ট্রান্সপ্ল্যান্ট

দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ কী?
কিডনি নিজস্ব কোনো রোগে আক্রান্ত হলে, অথবা অন্য কোনো রোগে কিডনি আক্রান্ত হওয়ায় কিডনির কার্যকারিতা তিন মাস বা ততোধিক সময় পর্যন্ত লোপ পেলে তা দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের লক্ষণ। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে যদি কিডনি রোগ ছাড়াও কিডনির কার্যকারিতা লোপ পায় তাহলেও তাকে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ বলা যেতে পারে। যেমন—ক্রনিক নেফ্রাইটিস কিডনির ফিল্টারকে আক্রমণ করে ক্রমান্বয়ে কিডনির কার্যকারিতা কমিয়ে ফেলতে পারে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ হতে পারে। ঠিক তেমনি ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ কিডনি রোগ না হওয়া সত্ত্বেও কিডনির ফিল্টার/ছাঁকনি ধ্বংস করতে পারে। আবার কারও যদি জন্মগতভাবে কিডনির কার্যকারিতা কম থাকে অথবা কিডনির আকার ছোট বা বেশি বড় থাকে তাহলেও দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ হতে পারে।

কী এই কিডনির ছাঁকনি
মানুষ জন্মগ্রহণ করার ৬ সপ্তাহের মধ্যেই কিডনির ছাঁকনি বা ফিল্টার মেমব্রেন পুরোপুরি তৈরি হয়ে যায়। অর্থাত্ কিডনি পুরোদমে কাজ শুরু করতে পারে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির প্রতিটি কিডনিতে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ ছাঁকনি রয়েছে এবং প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ১৭০ লিটার রক্ত পরিশোধন করে। এই পরিশোধিত রক্তের মধ্যে এক থেকে তিন লিটার শরীরের বর্জ্য পদার্থ প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়া হয়। সুতরাং কোনো কারণবশত যদি এ ধরনের ফিল্টার বাধাপ্রাপ্ত হয়, তখন দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ হতে পারে।
কিডনির কার্যকারিতা যাচাই করার জন্য রক্তে ক্রিয়েটিনিন নামে জৈব পদার্থ পরিমাপ করা হয়, যার মাধ্যমে কিডনি কতটুকু কাজ করছে তা বোঝা যায়। দুঃখজনক বিষয় হলো এই জৈব পদার্থটি ৫০ শতাংশ কিডনির কার্যকারিতা নষ্ট হওয়ার পরেই শরীরে বাড়তে পারে। একজন সুস্থ পুরুষ লোকের শরীরে ক্রিয়েটিনিন ১.৪ মিলিগ্রাম এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে ১.৩ মিলিগ্রাম হিসেবে স্বাভাবিক ধরা হয়। যদি এই ক্রিয়েটিনিন পুরুষের ক্ষেত্রে ১.৪ মিলিগ্রামের ওপরে ৩ মাস বা ততোধিক কাল স্থায়ী থাকে তখন তাকে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগী হিসাবে শনাক্ত করা হয়।

দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের জটিলতা
দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের সবচেয়ে অসুবিধা হলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ ধরনের রোগীদের কোনো উপসর্গ হয় না। ফলে বছরের পর বছর তারা চিকিত্সকের শরণাপন্ন হয় না। যখন তাদের উপসর্গ দেখা দেয়, তখন তাদের কিডনির কার্যকারিতা ৭৫ শতাংশ লোপ পায়। কিডনির কার্যকারিতা ৭৫ শতাংশ লোপ পাওয়ার পরে ওষুধের মাধ্যমে চিকিত্সা করে পরিপূর্ণ সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। ফলে কিডনি যখন ক্রমান্বয়ে সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ে তখন তারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে যদি দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ নিরূপণ করা যেত তাহলে চিকিত্সার মাধ্যমে এই রোগগুলোকে আংশিক বা পরিপূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব হতো। সুতরাং কোনো রোগী দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে ভুগছে কিনা, এজন্য জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি অত্যন্ত জরুরি।

দরকার নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা
শুধু সচেতনতার মাধ্যমেই একজন রোগীর কিডনি রোগ আছে কিনা তা জানা সম্ভব। যেমন—যে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক লোকের উপসর্গ থাকুক বা না থাকুক তার রক্তচাপ নিয়মিত পরিমাপ করা, প্রস্রাবে অ্যালবুমিন নির্গত হচ্ছে কিনা তা জানা এবং ডায়াবেটিস আছে কিনা তা নিরূপণ করা প্রয়োজন। যদি কারও ডায়াবেটিস ধরা পড়ে অথবা ডায়াবেটিসে ভুগে থাকেন, তার অন্তত বছরে একবার প্রস্রাবে অ্যালবুমিন এবং মাইক্রো অ্যালবুমিন যাচ্ছে কিনা এবং রক্তে ক্রিয়েটিনিন স্বাভাবিক কিনা তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।

কিডনি রোগের ভয়াবহতা
বেশিরভাগ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের কোনো উপসর্গ হয় না। তাই তারা ডাক্তারের শরণাপন্ন হন না। সুতরাং দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের উপসর্গগুলো সম্পর্কে সবার ধারণা থাকা প্রয়োজন। যদিও দীর্ঘস্থায়ীভাবে কিডনি অকেজো থাকায় বমি বমি ভাব, ক্ষুধামান্দ্য, রক্তস্বল্পতা, শরীরে পানি জমা, শ্বাসকষ্ট এবং প্রস্রাবের পরিমাণের তারতম্য, চর্মরোগ ছাড়াই শরীর চুলকানো এবং ক্রমান্বয়ে দৈনন্দিন কার্যকারিতা লোপ পাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। আমাদের দেশে শতকরা ৮০ ভাগ রোগী এই উপসর্গগুলো নিয়েই চিকিত্সকের শরণাপন্ন হন এবং রক্ত পরীক্ষায় দেখা যায়, কিডনির ৮০ ভাগ কার্যকারিতাই তখন নষ্ট হয়ে গেছে। দীর্ঘস্থায়ীভাবে কিডনি অকেজো থাকার ফলে উপরোক্ত উপসর্গ ছাড়াও শরীরে অনেক জটিলতা দেখা দেয়, যার মধ্যে প্রধান হলো হৃিপণ্ডের রোগ।

কিছু সমীক্ষা...
বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে এটা প্রতীয়মান হয় যে, যারা দীর্ঘস্থায়ী কিডনি অকেজো রোগে ভোগে তাদের হৃিপণ্ডে রোগের আশঙ্কা ১০ থেকে ৩০ ভাগ বৃদ্ধি পায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৭০ ভাগও ছাড়িয়ে যেতে পারে। যেমন—যুক্তরাষ্ট্রের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী কিডনি অকেজো রোগীরা ৮০ থেকে ৯০ ভাগ উচ্চ রক্তচাপে, ২৫ ভাগ হার্টস্ট্রোক এবং ২০ ভাগ হার্ট ফেইলিয়র রোগে ভুগে থাকে। ৭৫ ভাগের হৃিপণ্ডের প্রকোষ্ঠ বড় হয়ে যায় এবং ৬ ভাগের ক্ষেত্রে ব্রেইন স্ট্রোকের প্রবণতা বেড়ে যায়। আর ডায়াবেটিসজনিত কিডনি রোগের কারণে উপরোক্ত হার আরও বৃদ্ধি পায়। এছাড়া কিডনি অকেজো রোগীরা সব সময়েই রক্তস্বল্পতায় ভুগে থাকে, যা পরবর্তীকালে হৃিপণ্ডের প্রকোষ্ঠের আকার বড় করে হার্ট ফেইলিয়র ঘটাতে পারে। এছাড়া এদের রক্তে চর্বিতে ভারসাম্য থাকে না এবং ভিটামিন ডি-এর অভাব হয়।

প্রতিবছর মারা যায় ৪০ হাজার
বিভিন্ন হাসপাতালের পরিসংখ্যান থেকে এটা ধারণা করা হয়—বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪০ হাজার রোগীর কিডনি সম্পূর্ণভাবে অকেজো হয়ে মারা যায়। এই ঊর্ধ্বহারে কিডনি অকেজো হওয়ার কারণ হিসাবে নেফ্রাইট্রিস, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপকেই দায়ী করা হয়ে থাকে। নেফ্রাইটিস রোগের প্রধান কারণ হিসেবে ব্যাকটেরিয়াজনিত ইনফেকশন, ভাইরাল হেপাটাইটিস, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর এবং ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াকে দায়ী করা হয়। খাবারে রাসায়নিক পদার্থ মেশানো এবং ভেজালকে ক্রনিক ইন্টারস্টেশিয়াল নেফ্রাইটিসের কারণ হিসেবে দায়ী করা যেতে পারে। এমনকি পানিতে অধিক পরিমাণে আর্সেনিক কিডনি রোগের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিতে পারে। মার্কারি, লেড, গোল্ড এবং অন্যান্য ধাতব পদার্থ কিডনি রোগের কারণ হতে পারে। হেপাটাইটিস ‘বি’ এবং ‘সি’ ভাইরাস এইচআইভি ভাইরাস দক্ষিণ আফ্রিকাতে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের একটি বড় কারণ। ঠিক তেমনি ম্যালেরিয়া আফ্রিকা মহাদেশে কিডনি রোগের কারণ হিসেবে বিবেচিত।

কিডনি অকেজো রোগীর চিকিত্সা
কিডনি সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে গেলে শুধু ওষুধের মাধ্যমে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন হয় নিয়মিত ডায়ালাইসিস অথবা কিডনি সংযোজন। বর্তমান বিশ্বে নিয়মিত ডায়ালাইসিস করে একজন রোগী ৫ থেকে ১৫ বছর এবং সফল কিডনি সংযোজনের মাধ্যমে ১০-১৫ বছর স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। পৃথিবীতে নিয়মিত হেমোডায়ালাইসিসের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৩০ বছর পর্যন্ত রোগী বেঁচে আছে এবং সফল কিডনি সংযোজনের ক্ষেত্রে প্রায় ৩৩ বছর বেঁচে থাকার রেকর্ড রয়েছে। (নিয়মিত ডায়ালাইসিস বলতে সপ্তাহে ৩ বার ৪ ঘণ্টা করে হেমোডায়ালাইসিস মেশিনের মাধ্যমে চিকিত্সা করা বোঝায়।) ঠিক তেমনি নিকট আত্মীয়ের কিডনি নিয়ে প্রতিস্থাপন করে কিডনি সংযোজন করা হয়। অবশ্য উন্নত বিশ্বে মৃত ব্যক্তির কিডনি নিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কিডনি সংযোজন করা হয়ে থাকে।

কিডনি রোগ শনাক্ত করা দরকার
বর্তমানে উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ কীভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব, তা নিয়ে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। গ্রাম ও শহর পর্যায়ে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ শনাক্ত করে তা চিকিত্সার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশে গ্রাম পর্যায়ের চলমান গবেষণা থেকে দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৮ ভাগ যাদের মধ্যে ১৮.৫ ভাগেরই উচ্চ রক্তচাপ, ৫ ভাগের ডায়াবেটিস এবং ৬ ভাগের প্রস্রাবে প্রোটিন নির্গত হয়। এই ৫ ভাগ ডায়াবেটিস রোগীর ৩০ ভাগ এবং ১৮ ভাগ উচ্চ রক্তচাপের ১৫ ভাগ এবং ৬ ভাগ রোগীর যাদের প্রস্রাবে প্রোটিন নির্গত হয়, সবাই দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত বলে ধারণা করা হয়। ওই সমীক্ষায় রোগীদের প্রশ্ন রাখা হয়েছিল—তারা ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং প্রস্রাবে প্রোটিন নির্গত হওয়া সম্পর্কে জানেন কিনা। ৬০ ভাগ রোগী জানেনই না যে তাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ অথবা প্রস্রাবে প্রোটিন নির্গত হয় এবং তারা চিকিত্সকের শরণাপন্ন হননি। সুতরাং এই রোগীগুলোই দীর্ঘস্থায়ী কিডনি অকেজো রোগে ভোগার পর ক্রমান্বয়ে সম্পূর্ণভাবে কিডনি বিনষ্ট হয়। এই রোগীগুলোকেই শনাক্ত করে চিকিত্সার ব্যবস্থা করা উচিত।

কিডনি রোগ প্রতিরোধের উপায়
এটা পরীক্ষিত যে, এসিই-ইনহেবিটরস এবং এআরবি জাতীয় উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ কিডনি রোগ প্রতিরোধে খুবই কার্যকর। ঠিক তেমনি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং মাইক্রো অ্যালবুমিন ধরা পড়লে জরুরি ভিত্তিতে চিকিত্সা করা প্রয়োজন। এছাড়া নিয়মিত ব্যায়াম, ফাস্টফুড না খাওয়া, চর্বিজাতীয় খাবারের প্রতি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা গেলে কিডনি রোগ প্রতিরোধ সম্ভব। এছারাও ক্ষেত্রবিশেষে চর্বি নিয়ন্ত্রণকারী ওষুধ খেলে, ধূমপান না করলে কিডনি রোগ প্রতিরোধ করা যায় এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত হৃদরোগ থেকেও রেহাই পাওয়া যায়।
কিডনি রোগীদের সচেতন করে এবং প্রাথমিক পর্যায়ে এ রোগ শনাক্তকরণের সঙ্গে সঙ্গে চিকিত্সার ব্যবস্থা করলে লাখ লাখ কিডনি রোগীর কিডনি সম্পূর্ণ নষ্ট হওয়া থেকে অনেকাংশে রক্ষা পাবে। পাশাপাশি কিডনি অকোজো রোগীরা ডায়ালাইসিস ও কিডনি সংযোজনের বিশাল খরচ থেকে মুক্তি পাবে।                                                                   
















  কিডনি রোগ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই শ্রেয়

ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ‘Prevention is better than cure.’ এটা প্রায় সব রোগের ক্ষেত্রেই কম-বেশি প্রযোজ্য। বিশেষত কিডনি রোগের বেলায় তো বটেই। নিচে কিডনি রোগগুলোর শ্রেণীবিন্যাস ও প্রতিরোধ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

অ্যাকিউট নেফ্রাইটিসের কারণ
গলায় প্রদাহ, সোরথ্রোট বা স্ট্রেপটোকক্কাল প্রদাহ, খোস-পাঁচড়া (পায়োডারমা), ম্যালেরিয়া, জন্ডিস (ভাইরাল হেপাটাইটিস) প্রভৃতি।
প্রতিরোধ : ক. স্ট্রেপটোকক্কাল সোরথ্রোটের দ্রুত ও সঠিক চিকিত্সা।
খ. খোস-পাঁচড়া, ম্যালেরিয়ার দ্রুত ও সঠিক চিকিত্সা।
গ. যেসব ওষুধের কারণে নেফ্রাইটিসের লক্ষণ প্রকাশ পায়, সেগুলো সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করা।
ঘ. রক্ত দেয়া ও নেয়ার সময় বি-হেপাটাইটিসের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ ব্যবহার করতে হবে ও প্রয়োজনে ভ্যাকসিন নিতে হবে।

কিডনি প্রদাহের কারণ
— পেরিএনাল রিজিওন বা মলদ্বারের আশপাশ থেকে জীবাণু যোনিপথে বাসা বাঁধে এবং সেখান থেকে প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে কিডনিতে যায় এবং প্রদাহের সৃষ্টি করে। রক্ত কোনো জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হয়ে কিডনির প্রদাহ হতে পারে। এটি বিবাহিত এবং গর্ভবতী মায়েদের বেশি হয়ে থাকে।
— ডায়াবেটিস রোগীর শর্করা অনিয়ন্ত্রণ এবং ইমিউনিটি কম থাকার কারণে এটা বেশি হয়।
— বাচ্চাদের যদি জন্মগত কোনো ম্যালফরমেশন থাকে বা বয়স্কদের প্রস্টেটিক এনলার্জমেন্টের জন্য এটা হয় বা রিফ্লাক্স থাকে।
প্রতিরোধের উপায় : ব্যক্তিগত শরীরচর্চা বিশেষত, পেরিনিয়াল হাইজিন ভালো রাখা প্রয়োজন। কিডনির প্রদাহ হলে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের পরামর্শমত চিকিত্সা গ্রহণ করা উচিত।
— বিবাহিত মেয়েদের বারবার প্রস্রাব ইনফেকশনের জন্য ও গর্ভবতী মায়ের কিডনির প্রদাহ হয়ে কিডনির ক্ষতি রোধ করার জন্য অনেকদিন ধরে একটা অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হবে।
— ডায়াবেটিস রোগীদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রোগ নির্ণয় করতে হবে। ডায়াবেটিস রোগীদের শর্করা নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য।
— জন্মগত ত্রুটি, প্রস্টেটিক এনলার্জমেন্ট প্রয়োজনে সার্জারি করে ভালো করতে হবে।

কিডনিতে পাথুরি রোগের কারণ
— প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থির অতিরিক্ত কাজের জন্য।
— কিডনির টিবিউলস স্বাভাবিক কাজ না করলে, পানি কম খেলে, ঘাম বেশি হয়ে প্রস্রাব কম হলে।
— অতিরিক্ত দুধ, অ্যান্টাসিড খেলে ও বেশি ভিটামিন ডি খাওয়ার কারণে।
— গাউট জাতীয় জয়েন্ট ডিজিজ।
— কোনো কারণে অন্ত্র থেকে অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম রক্তে চলে এলে।
যা করণীয় : প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থি বেশি কাজ করলে তা সার্জারির মাধ্যমে ফেলে দিতে হবে।
— প্রতিদিন বেশি পরিমাণ পানি (কমপক্ষে ৬ থেকে ৮ লিটার) খেতে হবে।
— অতিরিক্ত ভিটামিন ডি, দুধ, অ্যান্টাসিড খাওয়া বন্ধ করতে হবে।
— গাউটের চিকিত্সা করতে হবে এলুপুরিনাল দিয়ে।
— যেসব খাবারে পাথর তৈরির কম্পোনেন্ট বেশি, সেগুলো কম খেতে হবে বা পরিহার করতে হবে।

অ্যাকিউট রেনাল ফেইলিয়রের কারণ
— ডায়রিয়া বা বমির কারণে বেশি পরিমাণ লবণ-পানি শরীর থেকে বেরিয়ে গেলে।
— যে কোনো কারণে শরীরের ভেতরে বা বাইরে রক্তক্ষরণ হলে।
— মারাত্মক কোনো নেফ্রাইটিস রোগ হলে।
— কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে।
— পাথর, টিউমার বা অন্য কোনো কারণে একত্রে দু’দিকের ইউরেটাল বন্ধ হয়ে গেলে।
— অজ্ঞ ধাত্রী দিয়ে গর্ভপাত করালে।
— সেপটিসমিয়া বা ব্যাকটেরিমিয়ার কারণে রক্ত সংক্রমিত হয়।
প্রতিরোধ : জ্বর, ডায়রিয়া, বমির কারণে ও শরীরে লবণ বা পানির ঘাটতি হলে রোগীকে প্রচুর পানি খাওয়াতে হবে এবং ওরাল স্যালাইন খাওয়াতে হবে বা দিতে হবে।
— রক্তপাত হলে রোগীকে রক্ত সঞ্চালনের ব্যবস্থা করাতে হবে।
— বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে হবে।
— কোনো ওষুধ খাওয়ার পর প্রস্রাব কম হলে সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ বন্ধ করে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। জ্বর ও প্রদাহের কারণে যারা প্যারাসিটামল বা কোট্রাইমোক্সাজোল ওষুধ খাচ্ছেন তাদের প্রচুর পানি খেতে উপদেশ দিতে হবে।
— বাধাজনিত কিডনি রোগ সার্জারির মাধ্যমে বা বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের পরামর্শমত চিকিত্সা নিতে হবে।
— প্রয়োজন হলে অভিজ্ঞ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রী, সম্ভব হলে ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে গর্ভপাত করানো উচিত।
— বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের পরামর্শমত চিকিত্সা করাতে হবে।

ক্রনিক রেনাল ফেইলিয়র
১.নেফ্রাইটিস, ২. বহুমূত্রজনিত কিডনি রোগ, ৩. উচ্চ রক্তচাপজনিত কিডনি রোগ, ৪. কিডনিতে পাথর বা প্রস্রাবের রাস্তায় বাধার কারণে এ সমস্যা হতে পারে।
প্রতিরোধ : এই রোগগুলো যেহেতু অনেকদিন ধরে চলতে থাকে, সেজন্য রোগীদের সব সময় ডাক্তারের পরামর্শমত চলতে হয়। নেফ্রাইটিসের কারণ বের করে চিকিত্সা করতে হবে।
— বহুমূত্র বা উচ্চ রক্তচাপের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিত্সা নিতে হবে।
— শৈল্য চিকিত্সার মাধ্যমে পাথর এবং প্রস্রাবের রাস্তার বাধার উপযুক্ত চিকিত্সা
করতে হবে।
ওপরের আলোচনা থেকে একথা স্পষ্ট যে, প্রয়োজনমত পানি খেলে, গলায় প্রদাহ বা খোস-পাঁচড়াকে অবহেলা না করে সঙ্গে সঙ্গে চিকিত্সকদের পরামর্শ নিলে কিডনি রোগ. বিশেষত নেফ্রাইটিস অনেকাংশেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। জ্বর, বমি, পাতলা পায়খানা, রক্তপাত ইত্যাদি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীকে উপযুক্ত ফ্লুইড বা রক্ত রিপ্লেসমেন্ট দেয়া প্রয়োজন। এছাড়াও বেশি ওষুধ খাওয়ার কারণে বা ওষুধের প্রতিক্রিয়ার কারণে কিডনির অসুবিধা দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে সে ওষুধ বাদ দিয়ে চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে হবে। এছাড়াও জন্মগত ত্রুটি, প্রস্টেট গ্লান্ড বা প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থি বড় হলে বা পাথর টিউমারের কারণে দুই দিকের ইউরেটার একত্রে বন্ধ হয়ে গেলে তাত্ক্ষণিকভাবে সার্জারির সাহায্যে এসব বাধা দূর করতে হবে। সুতরাং এসব লক্ষণগুলো মনে রাখলে কিডনি রোগ বহুলাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।




 কিডনি সুস্থ রাখতেমানবকণ্ঠ ডেস্ক

সুস্থ হৃৎপিণ্ডের মতোই গুরুত্বপূর্ণ কিডনির সুস্থতা। যাদের কিডনির সমস্যা আছে কেবল তারাই জানেন এটি কতটা যন্ত্রণাদায়ক। তবে প্রতিদিনের খাদ্য 


তালিকায় 
কিছু খাবার যোগ করে আমরা কিডনি সুস্থ রাখতে পারি। যেমন লাল ক্যাপসিক্যাম। এই সবজিটি রক্ত পরিশোধক হিসেবে কাজ করে। এটি কিডনি রোগীদের 

জন্য খুবই উপকারী। ডিমের সাদা অংশে প্রোটিন ও অল্প পরিমাণে ফসফরাস রয়েছে। এটা যাদের

 কিডনি সমস্যা আছে তাদের 

জন্য উপকারী। বাঁধাকপির 

ফাইটোকেমিক্যাল শরীরে ফ্রি রেডিকেলের ক্ষতি প্রতিরোধ করে। ফ্রি রেডিকেল আমাদের শরীর ও 

ত্বকের জন্য ক্ষতিকর। মাছের ওমেগা-৩ ফ্যাট  কিডনির 

সমস্যা কমিয়ে আনতে সাহায্য করে। এছাড়া মাছ প্রোটিনের খুব ভালো উৎস। ফলের কিংবা সবজির 

জুস শরীরের বর্জ্য পদার্থ শরীর থেকে বের করে দেয়। বিশেষ 

করে যে কিডনি রোগীর ডায়ালাইসিস করতে হয়, সবজি জুসের ফাইটোকেমিক্যাল তাদের জন্য খুবই 

উপকারী। এ কেমিক্যাল কিডনি ফেইলর ঠেকাতে 

সহায়তা করে। আর ফলের রসের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কিডনি সুস্থ রাখে। - টাইমস অব ইন্ডিয়া
Like ·  ·