Saturday, March 9, 2013

কিডনি রোগ

কিডনি রোগ সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য
আপনি জানেন কি?
—মানুষের দুটো কিডনি প্রতিদিন প্রায় ১৭০ লিটার রক্ত পরিশোধিত করে শরীরকে সুস্থ রাখে?
—দুটো কিডনিতে প্রায় ২০-২৫ লাখ ছাঁকনি রয়েছে, যা অনবরত রক্তকে পরিশোধিত করে যাচ্ছে।
—কিডনি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে রক্তস্বল্পতা দূর করতে সাহায্য করে এবং অস্থি শক্তিশালী করে থাকে।
—শরীর সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখার জন্য একটি কিডনিই যথেষ্ট।
—কিডনির প্রধান রোগ নেফ্রাইটিস বা নেফ্রোটিক সিনড্রম, যা কিডনির ছাঁকনি বা ফিলটার মেমব্রেনকে ক্ষতবিক্ষত করে। এর কারণে শরীর থেকে অত্যাবশ্যকীয় প্রোটিন বেরিয়ে যায়।
—প্রস্রাব প্রদাহ কিডনির একটি সাধারণ রোগ হলেও শিশুদের ক্ষেত্রে মারাত্মক হতে পারে।
—ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ কিডনি রোগ নয়, তবু কিডনিকে আক্রান্ত করে কিডনির কার্যকারিতা কমিয়ে মারাত্মক জটিলতার সৃষ্টি করে।
—যেসব রোগ কিডনিকে আক্রান্ত করে কিডনির কার্যকারিতা বিনষ্ট করে বা কিডনি ফেইলিয়র হয় এদের মধ্যে—১. নেফ্রাইটিস ২. ডায়াবেটিস এবং ৩. উচ্চ রক্তচাপ। সুতরাং প্রাথমিক পর্যায়ে এসব রোগের চিকিত্সায় যত্নবান হন।
—দুটো কিডনি ৯০ ভাগ অকেজো হওয়ার পরই কেবল ডায়ালাইসিস বা কিডনি সংযোজনের মতো চিকিত্সার প্রয়োজন হয়।
—জীবিত অবস্থায় আপনি আপনার একটি কিডনি কেবল বাবা-মা, ভাই-বোন, ছেলে-মেয়েকে নির্ভয়ে দান করতে পারেন। এদের ভেতর রক্তের গ্রুপ বা টিস্যু টাইপ না মিললে তখন আপন চাচা, মামা, ফুফু, খালা বা স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে কিডনি দান করতে পারেন।
—মৃত ব্যক্তি (ব্রেনডেথ-ভেন্টিলেটরে থাকা অবস্থায়), আত্মীয়-অনাত্মীয় সবাইকে কিডনি দান করতে পারে।
—আকস্মিক কিডনি বিকল রোগে তাত্ক্ষণিক চিকিত্সা অনেক রোগীকে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে।
—অতিরিক্ত ডায়রিয়া, বমি ও রক্তক্ষরণ আকস্মিক কিডনি বিকল হওয়ার প্রধান কারণ।
—মেয়েদের গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ পরবর্তী পর্যায়ে কিডনি রোগের কারণ হতে পারে।

কিছু পরামর্শ ও পরিসংখ্যানগত তথ্য
—শতকরা ৩০ থেকে ৪০ ভাগ ডায়াবেটিস রোগী কিডনি রোগে ভুগে থাকেন।
—উচ্চ রক্তচাপের কারণে ২০ থেকে ৪০ ভাগ রোগীর কিডনি অকেজো হতে পারে।
—ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখুন এবং কিডনি রোগ থেকে বাঁচুন।
—শুধু রক্তচাপ, প্রস্রাব পরীক্ষা এবং রক্তের ক্রিয়েটিনিন ও সুগার পরীক্ষা করেই জানা যায় কিডনি রোগ আছে কিনা?
—কিডনি সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে গেলে ডায়ালাইসিস অথবা কিডনি সংযোজনই হলো বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়।
—শিশুদের টনসিলাইটিস, প্রস্রাবে প্রদাহ ও চর্মরোগের তাত্ক্ষণিক চিকিত্সা করুন।
—কিডনি রোগ ছোঁয়াচে নয়, তবে বংশানুক্রমিক হতে পারে।
—আপনার বয়স যদি ৪০ বছরের ওপর হয়, আপনি যদি ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপে ভুগে থাকেন, অথবা বংশে যদি কিডনি রোগ থাকে, তবে অবশ্যই আপনার রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করে জেনে নিন, আপনার কিডনি রোগ আছে কিনা?
—সচেতন হলে স্বল্পব্যয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে কিডনি রোগ নির্ণয় ও প্রতিরোধ করা সম্ভব।
—বর্তমান ধারায় কিডনি রোগী বৃদ্ধি পেলে ২০২০ সালে বাংলাদেশে ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ ক্রনিক কিডনি রোগে আক্রান্ত হবে।
—বাংলাদেশে বর্তমানে দুই কোটি লোক কোনো না কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত।
—বাংলাদেশে প্রায় ৪০ হাজার রোগী ধীর গতিতে কিডনি অকেজো হয়ে প্রতিবছর অকালে মৃত্যুবরণ করে।
—অ্যান্টিবায়োটিক ও ব্যথানাশক ওষুধ ব্যবহার শতকরা ১৫ থেকে ২০ ভাগ কিডনি রোগের কারণ হতে পারে।
—কিডনি নষ্ট হলে ডায়ালাইসিস করে চিকিত্সা করার সামর্থ্য বাংলাদেশের শতকরা ১০ জনেরও নেই। তাই কিডনি রোগ সম্পর্কে জানুন, সতর্ক থাকুন এবং প্রতিরোধ করুন।
—নেফ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে কিডনি বিকল হওয়ার কারণ।                                                                                                                                    







 কিডনি রোগ প্রতিরোধ সম্ভব
অধ্যাপক হারুন আর রশিদ

সভাপতি,
কিডনি ফাউন্ডেশন ও
সোসাইটি অব অরগান ট্রান্সপ্ল্যান্ট

দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ কী?
কিডনি নিজস্ব কোনো রোগে আক্রান্ত হলে, অথবা অন্য কোনো রোগে কিডনি আক্রান্ত হওয়ায় কিডনির কার্যকারিতা তিন মাস বা ততোধিক সময় পর্যন্ত লোপ পেলে তা দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের লক্ষণ। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে যদি কিডনি রোগ ছাড়াও কিডনির কার্যকারিতা লোপ পায় তাহলেও তাকে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ বলা যেতে পারে। যেমন—ক্রনিক নেফ্রাইটিস কিডনির ফিল্টারকে আক্রমণ করে ক্রমান্বয়ে কিডনির কার্যকারিতা কমিয়ে ফেলতে পারে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ হতে পারে। ঠিক তেমনি ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ কিডনি রোগ না হওয়া সত্ত্বেও কিডনির ফিল্টার/ছাঁকনি ধ্বংস করতে পারে। আবার কারও যদি জন্মগতভাবে কিডনির কার্যকারিতা কম থাকে অথবা কিডনির আকার ছোট বা বেশি বড় থাকে তাহলেও দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ হতে পারে।

কী এই কিডনির ছাঁকনি
মানুষ জন্মগ্রহণ করার ৬ সপ্তাহের মধ্যেই কিডনির ছাঁকনি বা ফিল্টার মেমব্রেন পুরোপুরি তৈরি হয়ে যায়। অর্থাত্ কিডনি পুরোদমে কাজ শুরু করতে পারে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির প্রতিটি কিডনিতে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ ছাঁকনি রয়েছে এবং প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ১৭০ লিটার রক্ত পরিশোধন করে। এই পরিশোধিত রক্তের মধ্যে এক থেকে তিন লিটার শরীরের বর্জ্য পদার্থ প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়া হয়। সুতরাং কোনো কারণবশত যদি এ ধরনের ফিল্টার বাধাপ্রাপ্ত হয়, তখন দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ হতে পারে।
কিডনির কার্যকারিতা যাচাই করার জন্য রক্তে ক্রিয়েটিনিন নামে জৈব পদার্থ পরিমাপ করা হয়, যার মাধ্যমে কিডনি কতটুকু কাজ করছে তা বোঝা যায়। দুঃখজনক বিষয় হলো এই জৈব পদার্থটি ৫০ শতাংশ কিডনির কার্যকারিতা নষ্ট হওয়ার পরেই শরীরে বাড়তে পারে। একজন সুস্থ পুরুষ লোকের শরীরে ক্রিয়েটিনিন ১.৪ মিলিগ্রাম এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে ১.৩ মিলিগ্রাম হিসেবে স্বাভাবিক ধরা হয়। যদি এই ক্রিয়েটিনিন পুরুষের ক্ষেত্রে ১.৪ মিলিগ্রামের ওপরে ৩ মাস বা ততোধিক কাল স্থায়ী থাকে তখন তাকে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগী হিসাবে শনাক্ত করা হয়।

দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের জটিলতা
দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের সবচেয়ে অসুবিধা হলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ ধরনের রোগীদের কোনো উপসর্গ হয় না। ফলে বছরের পর বছর তারা চিকিত্সকের শরণাপন্ন হয় না। যখন তাদের উপসর্গ দেখা দেয়, তখন তাদের কিডনির কার্যকারিতা ৭৫ শতাংশ লোপ পায়। কিডনির কার্যকারিতা ৭৫ শতাংশ লোপ পাওয়ার পরে ওষুধের মাধ্যমে চিকিত্সা করে পরিপূর্ণ সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। ফলে কিডনি যখন ক্রমান্বয়ে সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ে তখন তারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে যদি দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ নিরূপণ করা যেত তাহলে চিকিত্সার মাধ্যমে এই রোগগুলোকে আংশিক বা পরিপূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব হতো। সুতরাং কোনো রোগী দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে ভুগছে কিনা, এজন্য জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি অত্যন্ত জরুরি।

দরকার নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা
শুধু সচেতনতার মাধ্যমেই একজন রোগীর কিডনি রোগ আছে কিনা তা জানা সম্ভব। যেমন—যে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক লোকের উপসর্গ থাকুক বা না থাকুক তার রক্তচাপ নিয়মিত পরিমাপ করা, প্রস্রাবে অ্যালবুমিন নির্গত হচ্ছে কিনা তা জানা এবং ডায়াবেটিস আছে কিনা তা নিরূপণ করা প্রয়োজন। যদি কারও ডায়াবেটিস ধরা পড়ে অথবা ডায়াবেটিসে ভুগে থাকেন, তার অন্তত বছরে একবার প্রস্রাবে অ্যালবুমিন এবং মাইক্রো অ্যালবুমিন যাচ্ছে কিনা এবং রক্তে ক্রিয়েটিনিন স্বাভাবিক কিনা তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।

কিডনি রোগের ভয়াবহতা
বেশিরভাগ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের কোনো উপসর্গ হয় না। তাই তারা ডাক্তারের শরণাপন্ন হন না। সুতরাং দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের উপসর্গগুলো সম্পর্কে সবার ধারণা থাকা প্রয়োজন। যদিও দীর্ঘস্থায়ীভাবে কিডনি অকেজো থাকায় বমি বমি ভাব, ক্ষুধামান্দ্য, রক্তস্বল্পতা, শরীরে পানি জমা, শ্বাসকষ্ট এবং প্রস্রাবের পরিমাণের তারতম্য, চর্মরোগ ছাড়াই শরীর চুলকানো এবং ক্রমান্বয়ে দৈনন্দিন কার্যকারিতা লোপ পাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। আমাদের দেশে শতকরা ৮০ ভাগ রোগী এই উপসর্গগুলো নিয়েই চিকিত্সকের শরণাপন্ন হন এবং রক্ত পরীক্ষায় দেখা যায়, কিডনির ৮০ ভাগ কার্যকারিতাই তখন নষ্ট হয়ে গেছে। দীর্ঘস্থায়ীভাবে কিডনি অকেজো থাকার ফলে উপরোক্ত উপসর্গ ছাড়াও শরীরে অনেক জটিলতা দেখা দেয়, যার মধ্যে প্রধান হলো হৃিপণ্ডের রোগ।

কিছু সমীক্ষা...
বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে এটা প্রতীয়মান হয় যে, যারা দীর্ঘস্থায়ী কিডনি অকেজো রোগে ভোগে তাদের হৃিপণ্ডে রোগের আশঙ্কা ১০ থেকে ৩০ ভাগ বৃদ্ধি পায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৭০ ভাগও ছাড়িয়ে যেতে পারে। যেমন—যুক্তরাষ্ট্রের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী কিডনি অকেজো রোগীরা ৮০ থেকে ৯০ ভাগ উচ্চ রক্তচাপে, ২৫ ভাগ হার্টস্ট্রোক এবং ২০ ভাগ হার্ট ফেইলিয়র রোগে ভুগে থাকে। ৭৫ ভাগের হৃিপণ্ডের প্রকোষ্ঠ বড় হয়ে যায় এবং ৬ ভাগের ক্ষেত্রে ব্রেইন স্ট্রোকের প্রবণতা বেড়ে যায়। আর ডায়াবেটিসজনিত কিডনি রোগের কারণে উপরোক্ত হার আরও বৃদ্ধি পায়। এছাড়া কিডনি অকেজো রোগীরা সব সময়েই রক্তস্বল্পতায় ভুগে থাকে, যা পরবর্তীকালে হৃিপণ্ডের প্রকোষ্ঠের আকার বড় করে হার্ট ফেইলিয়র ঘটাতে পারে। এছাড়া এদের রক্তে চর্বিতে ভারসাম্য থাকে না এবং ভিটামিন ডি-এর অভাব হয়।

প্রতিবছর মারা যায় ৪০ হাজার
বিভিন্ন হাসপাতালের পরিসংখ্যান থেকে এটা ধারণা করা হয়—বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪০ হাজার রোগীর কিডনি সম্পূর্ণভাবে অকেজো হয়ে মারা যায়। এই ঊর্ধ্বহারে কিডনি অকেজো হওয়ার কারণ হিসাবে নেফ্রাইট্রিস, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপকেই দায়ী করা হয়ে থাকে। নেফ্রাইটিস রোগের প্রধান কারণ হিসেবে ব্যাকটেরিয়াজনিত ইনফেকশন, ভাইরাল হেপাটাইটিস, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর এবং ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াকে দায়ী করা হয়। খাবারে রাসায়নিক পদার্থ মেশানো এবং ভেজালকে ক্রনিক ইন্টারস্টেশিয়াল নেফ্রাইটিসের কারণ হিসেবে দায়ী করা যেতে পারে। এমনকি পানিতে অধিক পরিমাণে আর্সেনিক কিডনি রোগের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিতে পারে। মার্কারি, লেড, গোল্ড এবং অন্যান্য ধাতব পদার্থ কিডনি রোগের কারণ হতে পারে। হেপাটাইটিস ‘বি’ এবং ‘সি’ ভাইরাস এইচআইভি ভাইরাস দক্ষিণ আফ্রিকাতে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের একটি বড় কারণ। ঠিক তেমনি ম্যালেরিয়া আফ্রিকা মহাদেশে কিডনি রোগের কারণ হিসেবে বিবেচিত।

কিডনি অকেজো রোগীর চিকিত্সা
কিডনি সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে গেলে শুধু ওষুধের মাধ্যমে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন হয় নিয়মিত ডায়ালাইসিস অথবা কিডনি সংযোজন। বর্তমান বিশ্বে নিয়মিত ডায়ালাইসিস করে একজন রোগী ৫ থেকে ১৫ বছর এবং সফল কিডনি সংযোজনের মাধ্যমে ১০-১৫ বছর স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। পৃথিবীতে নিয়মিত হেমোডায়ালাইসিসের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৩০ বছর পর্যন্ত রোগী বেঁচে আছে এবং সফল কিডনি সংযোজনের ক্ষেত্রে প্রায় ৩৩ বছর বেঁচে থাকার রেকর্ড রয়েছে। (নিয়মিত ডায়ালাইসিস বলতে সপ্তাহে ৩ বার ৪ ঘণ্টা করে হেমোডায়ালাইসিস মেশিনের মাধ্যমে চিকিত্সা করা বোঝায়।) ঠিক তেমনি নিকট আত্মীয়ের কিডনি নিয়ে প্রতিস্থাপন করে কিডনি সংযোজন করা হয়। অবশ্য উন্নত বিশ্বে মৃত ব্যক্তির কিডনি নিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কিডনি সংযোজন করা হয়ে থাকে।

কিডনি রোগ শনাক্ত করা দরকার
বর্তমানে উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ কীভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব, তা নিয়ে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। গ্রাম ও শহর পর্যায়ে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ শনাক্ত করে তা চিকিত্সার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশে গ্রাম পর্যায়ের চলমান গবেষণা থেকে দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৮ ভাগ যাদের মধ্যে ১৮.৫ ভাগেরই উচ্চ রক্তচাপ, ৫ ভাগের ডায়াবেটিস এবং ৬ ভাগের প্রস্রাবে প্রোটিন নির্গত হয়। এই ৫ ভাগ ডায়াবেটিস রোগীর ৩০ ভাগ এবং ১৮ ভাগ উচ্চ রক্তচাপের ১৫ ভাগ এবং ৬ ভাগ রোগীর যাদের প্রস্রাবে প্রোটিন নির্গত হয়, সবাই দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত বলে ধারণা করা হয়। ওই সমীক্ষায় রোগীদের প্রশ্ন রাখা হয়েছিল—তারা ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং প্রস্রাবে প্রোটিন নির্গত হওয়া সম্পর্কে জানেন কিনা। ৬০ ভাগ রোগী জানেনই না যে তাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ অথবা প্রস্রাবে প্রোটিন নির্গত হয় এবং তারা চিকিত্সকের শরণাপন্ন হননি। সুতরাং এই রোগীগুলোই দীর্ঘস্থায়ী কিডনি অকেজো রোগে ভোগার পর ক্রমান্বয়ে সম্পূর্ণভাবে কিডনি বিনষ্ট হয়। এই রোগীগুলোকেই শনাক্ত করে চিকিত্সার ব্যবস্থা করা উচিত।

কিডনি রোগ প্রতিরোধের উপায়
এটা পরীক্ষিত যে, এসিই-ইনহেবিটরস এবং এআরবি জাতীয় উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ কিডনি রোগ প্রতিরোধে খুবই কার্যকর। ঠিক তেমনি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং মাইক্রো অ্যালবুমিন ধরা পড়লে জরুরি ভিত্তিতে চিকিত্সা করা প্রয়োজন। এছাড়া নিয়মিত ব্যায়াম, ফাস্টফুড না খাওয়া, চর্বিজাতীয় খাবারের প্রতি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা গেলে কিডনি রোগ প্রতিরোধ সম্ভব। এছারাও ক্ষেত্রবিশেষে চর্বি নিয়ন্ত্রণকারী ওষুধ খেলে, ধূমপান না করলে কিডনি রোগ প্রতিরোধ করা যায় এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত হৃদরোগ থেকেও রেহাই পাওয়া যায়।
কিডনি রোগীদের সচেতন করে এবং প্রাথমিক পর্যায়ে এ রোগ শনাক্তকরণের সঙ্গে সঙ্গে চিকিত্সার ব্যবস্থা করলে লাখ লাখ কিডনি রোগীর কিডনি সম্পূর্ণ নষ্ট হওয়া থেকে অনেকাংশে রক্ষা পাবে। পাশাপাশি কিডনি অকোজো রোগীরা ডায়ালাইসিস ও কিডনি সংযোজনের বিশাল খরচ থেকে মুক্তি পাবে।                                                                   
















  কিডনি রোগ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই শ্রেয়

ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ‘Prevention is better than cure.’ এটা প্রায় সব রোগের ক্ষেত্রেই কম-বেশি প্রযোজ্য। বিশেষত কিডনি রোগের বেলায় তো বটেই। নিচে কিডনি রোগগুলোর শ্রেণীবিন্যাস ও প্রতিরোধ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

অ্যাকিউট নেফ্রাইটিসের কারণ
গলায় প্রদাহ, সোরথ্রোট বা স্ট্রেপটোকক্কাল প্রদাহ, খোস-পাঁচড়া (পায়োডারমা), ম্যালেরিয়া, জন্ডিস (ভাইরাল হেপাটাইটিস) প্রভৃতি।
প্রতিরোধ : ক. স্ট্রেপটোকক্কাল সোরথ্রোটের দ্রুত ও সঠিক চিকিত্সা।
খ. খোস-পাঁচড়া, ম্যালেরিয়ার দ্রুত ও সঠিক চিকিত্সা।
গ. যেসব ওষুধের কারণে নেফ্রাইটিসের লক্ষণ প্রকাশ পায়, সেগুলো সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করা।
ঘ. রক্ত দেয়া ও নেয়ার সময় বি-হেপাটাইটিসের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ ব্যবহার করতে হবে ও প্রয়োজনে ভ্যাকসিন নিতে হবে।

কিডনি প্রদাহের কারণ
— পেরিএনাল রিজিওন বা মলদ্বারের আশপাশ থেকে জীবাণু যোনিপথে বাসা বাঁধে এবং সেখান থেকে প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে কিডনিতে যায় এবং প্রদাহের সৃষ্টি করে। রক্ত কোনো জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হয়ে কিডনির প্রদাহ হতে পারে। এটি বিবাহিত এবং গর্ভবতী মায়েদের বেশি হয়ে থাকে।
— ডায়াবেটিস রোগীর শর্করা অনিয়ন্ত্রণ এবং ইমিউনিটি কম থাকার কারণে এটা বেশি হয়।
— বাচ্চাদের যদি জন্মগত কোনো ম্যালফরমেশন থাকে বা বয়স্কদের প্রস্টেটিক এনলার্জমেন্টের জন্য এটা হয় বা রিফ্লাক্স থাকে।
প্রতিরোধের উপায় : ব্যক্তিগত শরীরচর্চা বিশেষত, পেরিনিয়াল হাইজিন ভালো রাখা প্রয়োজন। কিডনির প্রদাহ হলে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের পরামর্শমত চিকিত্সা গ্রহণ করা উচিত।
— বিবাহিত মেয়েদের বারবার প্রস্রাব ইনফেকশনের জন্য ও গর্ভবতী মায়ের কিডনির প্রদাহ হয়ে কিডনির ক্ষতি রোধ করার জন্য অনেকদিন ধরে একটা অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হবে।
— ডায়াবেটিস রোগীদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রোগ নির্ণয় করতে হবে। ডায়াবেটিস রোগীদের শর্করা নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য।
— জন্মগত ত্রুটি, প্রস্টেটিক এনলার্জমেন্ট প্রয়োজনে সার্জারি করে ভালো করতে হবে।

কিডনিতে পাথুরি রোগের কারণ
— প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থির অতিরিক্ত কাজের জন্য।
— কিডনির টিবিউলস স্বাভাবিক কাজ না করলে, পানি কম খেলে, ঘাম বেশি হয়ে প্রস্রাব কম হলে।
— অতিরিক্ত দুধ, অ্যান্টাসিড খেলে ও বেশি ভিটামিন ডি খাওয়ার কারণে।
— গাউট জাতীয় জয়েন্ট ডিজিজ।
— কোনো কারণে অন্ত্র থেকে অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম রক্তে চলে এলে।
যা করণীয় : প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থি বেশি কাজ করলে তা সার্জারির মাধ্যমে ফেলে দিতে হবে।
— প্রতিদিন বেশি পরিমাণ পানি (কমপক্ষে ৬ থেকে ৮ লিটার) খেতে হবে।
— অতিরিক্ত ভিটামিন ডি, দুধ, অ্যান্টাসিড খাওয়া বন্ধ করতে হবে।
— গাউটের চিকিত্সা করতে হবে এলুপুরিনাল দিয়ে।
— যেসব খাবারে পাথর তৈরির কম্পোনেন্ট বেশি, সেগুলো কম খেতে হবে বা পরিহার করতে হবে।

অ্যাকিউট রেনাল ফেইলিয়রের কারণ
— ডায়রিয়া বা বমির কারণে বেশি পরিমাণ লবণ-পানি শরীর থেকে বেরিয়ে গেলে।
— যে কোনো কারণে শরীরের ভেতরে বা বাইরে রক্তক্ষরণ হলে।
— মারাত্মক কোনো নেফ্রাইটিস রোগ হলে।
— কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে।
— পাথর, টিউমার বা অন্য কোনো কারণে একত্রে দু’দিকের ইউরেটাল বন্ধ হয়ে গেলে।
— অজ্ঞ ধাত্রী দিয়ে গর্ভপাত করালে।
— সেপটিসমিয়া বা ব্যাকটেরিমিয়ার কারণে রক্ত সংক্রমিত হয়।
প্রতিরোধ : জ্বর, ডায়রিয়া, বমির কারণে ও শরীরে লবণ বা পানির ঘাটতি হলে রোগীকে প্রচুর পানি খাওয়াতে হবে এবং ওরাল স্যালাইন খাওয়াতে হবে বা দিতে হবে।
— রক্তপাত হলে রোগীকে রক্ত সঞ্চালনের ব্যবস্থা করাতে হবে।
— বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে হবে।
— কোনো ওষুধ খাওয়ার পর প্রস্রাব কম হলে সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ বন্ধ করে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। জ্বর ও প্রদাহের কারণে যারা প্যারাসিটামল বা কোট্রাইমোক্সাজোল ওষুধ খাচ্ছেন তাদের প্রচুর পানি খেতে উপদেশ দিতে হবে।
— বাধাজনিত কিডনি রোগ সার্জারির মাধ্যমে বা বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের পরামর্শমত চিকিত্সা নিতে হবে।
— প্রয়োজন হলে অভিজ্ঞ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রী, সম্ভব হলে ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে গর্ভপাত করানো উচিত।
— বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের পরামর্শমত চিকিত্সা করাতে হবে।

ক্রনিক রেনাল ফেইলিয়র
১.নেফ্রাইটিস, ২. বহুমূত্রজনিত কিডনি রোগ, ৩. উচ্চ রক্তচাপজনিত কিডনি রোগ, ৪. কিডনিতে পাথর বা প্রস্রাবের রাস্তায় বাধার কারণে এ সমস্যা হতে পারে।
প্রতিরোধ : এই রোগগুলো যেহেতু অনেকদিন ধরে চলতে থাকে, সেজন্য রোগীদের সব সময় ডাক্তারের পরামর্শমত চলতে হয়। নেফ্রাইটিসের কারণ বের করে চিকিত্সা করতে হবে।
— বহুমূত্র বা উচ্চ রক্তচাপের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিত্সা নিতে হবে।
— শৈল্য চিকিত্সার মাধ্যমে পাথর এবং প্রস্রাবের রাস্তার বাধার উপযুক্ত চিকিত্সা
করতে হবে।
ওপরের আলোচনা থেকে একথা স্পষ্ট যে, প্রয়োজনমত পানি খেলে, গলায় প্রদাহ বা খোস-পাঁচড়াকে অবহেলা না করে সঙ্গে সঙ্গে চিকিত্সকদের পরামর্শ নিলে কিডনি রোগ. বিশেষত নেফ্রাইটিস অনেকাংশেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। জ্বর, বমি, পাতলা পায়খানা, রক্তপাত ইত্যাদি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীকে উপযুক্ত ফ্লুইড বা রক্ত রিপ্লেসমেন্ট দেয়া প্রয়োজন। এছাড়াও বেশি ওষুধ খাওয়ার কারণে বা ওষুধের প্রতিক্রিয়ার কারণে কিডনির অসুবিধা দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে সে ওষুধ বাদ দিয়ে চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে হবে। এছাড়াও জন্মগত ত্রুটি, প্রস্টেট গ্লান্ড বা প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থি বড় হলে বা পাথর টিউমারের কারণে দুই দিকের ইউরেটার একত্রে বন্ধ হয়ে গেলে তাত্ক্ষণিকভাবে সার্জারির সাহায্যে এসব বাধা দূর করতে হবে। সুতরাং এসব লক্ষণগুলো মনে রাখলে কিডনি রোগ বহুলাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।




 কিডনি সুস্থ রাখতেমানবকণ্ঠ ডেস্ক

সুস্থ হৃৎপিণ্ডের মতোই গুরুত্বপূর্ণ কিডনির সুস্থতা। যাদের কিডনির সমস্যা আছে কেবল তারাই জানেন এটি কতটা যন্ত্রণাদায়ক। তবে প্রতিদিনের খাদ্য 


তালিকায় 
কিছু খাবার যোগ করে আমরা কিডনি সুস্থ রাখতে পারি। যেমন লাল ক্যাপসিক্যাম। এই সবজিটি রক্ত পরিশোধক হিসেবে কাজ করে। এটি কিডনি রোগীদের 

জন্য খুবই উপকারী। ডিমের সাদা অংশে প্রোটিন ও অল্প পরিমাণে ফসফরাস রয়েছে। এটা যাদের

 কিডনি সমস্যা আছে তাদের 

জন্য উপকারী। বাঁধাকপির 

ফাইটোকেমিক্যাল শরীরে ফ্রি রেডিকেলের ক্ষতি প্রতিরোধ করে। ফ্রি রেডিকেল আমাদের শরীর ও 

ত্বকের জন্য ক্ষতিকর। মাছের ওমেগা-৩ ফ্যাট  কিডনির 

সমস্যা কমিয়ে আনতে সাহায্য করে। এছাড়া মাছ প্রোটিনের খুব ভালো উৎস। ফলের কিংবা সবজির 

জুস শরীরের বর্জ্য পদার্থ শরীর থেকে বের করে দেয়। বিশেষ 

করে যে কিডনি রোগীর ডায়ালাইসিস করতে হয়, সবজি জুসের ফাইটোকেমিক্যাল তাদের জন্য খুবই 

উপকারী। এ কেমিক্যাল কিডনি ফেইলর ঠেকাতে 

সহায়তা করে। আর ফলের রসের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কিডনি সুস্থ রাখে। - টাইমস অব ইন্ডিয়া
Like ·  · 

1 comment:

  1. শিশুদের কিডনি রোগের লক্ষণ নিয়ে আমার অনেক সংশয় রয়েছে। কোথাও ভালো কোন তথ্য পাইনি।
    এমন একটি লেখা যদি আপনি পোস্ট করতেন তবে আমার জন্য অনেক ভালো হত।
    আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ এমন একটি লেখা আমাদের সাথে শেয়ার করার জন্য।

    ReplyDelete