Friday, March 8, 2013

ডায়াবেটিস

১.ডায়াবেটিস ও এক্সারসাইজ
ডা. এনএইচ সার্জা

ডায়াবেটিস রোগ নিয়ে ভুগছে না এমন পরিবারের সংখ্যা দিনে দিনে কমে আসছে। যদি এমন পরিবারের সদস্য না হয়ে থাকেন তবে আপনি ভাগ্যবানদের একজন বলাই যায়, কেননা এই ডায়াবেটিস ধীরে ধীরে শরীরের প্রধান প্রধান অঙ্গকে আক্রমণ করে। আমাদের টার্গেট হবে, যদি ডায়াবেটিস হয়েও যায় তবু রক্তে গ্লুকোজের লেভেল মেইন্টেইন করে একে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা। কেননা, রক্তে গ্লুকোজ স্বাভা
বিক থাকলেই আমরা এসব সমস্যাকে কমিয়ে রাখতে পারব। শারীরিক ব্যায়াম এই ব্যাপারে খুব ভালো ভূমিকা পালন করে। যদি রেগুলার ব্যায়াম করা যায়, তবে ডায়াবেটিস বেশ ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—ব্যায়াম কীভাবে করা যেতে পারে, আর এটা আসলে কীভাবেই বা কাজ করে?
যেভাবে করা যেতে পারে ব্যায়াম
প্রত্যহ সকালে বা বিকালে (অথবা দিনের কোনো একটা অংশে (চাকরিজীবীদের জন্য ঠিক সময় তারা নিজেরাই বের করতে পারবেন) ৪৫ থেকে ৬০ মিনিট করে হাঁটা বা দৌড়ান যেতে পারে। এই সহজ ব্যায়ামই সব ডায়াবেটিক সমস্যাকে থামিয়ে রাখতে প্রধান ভূমিকা পালন করে। আর শুধু ডায়াবেটিসই নয়, হার্টের স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য এর উপরে আর কিছু নেই।

যেভাবে কাজ করে
এটা বেশ ইন্টারেস্টিং। প্রথম জানতে হবে ডায়াবেটিস এ কি হয়। এখানে ইনসুলিনের অভাবে রক্তের গ্লুকোজ কোষের ভেতরে ঢুকতে পারে না, তাই রক্তে গ্লুকোজ এর পরিমাণ বেড়ে যায়। আর রক্তের গ্লুকোজ কোষের ভেতরে যেতে GLUT নামের সারফেস প্রোটিন কাজ করে, যেটার অনেকগুলো টাইপ রয়েছে এবং এর সবগুলো টাইপই কাজ করতে সরাসরি ইনসুলিনের ওপর নির্ভরশীল শুধু GLUT ৪ কাজ করে ব্যয়ামের মাধ্যমে। যখন মানুষ শারীরিক শ্রম করে তখন এই গ্লুট ৪ এর মাধ্যমে রক্তের গ্লুকোজ কোষের ভেতরে ঢুকে যায়। এভাবেই ব্যায়ামের মাধ্যমে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ কমে গিয়ে ডায়াবেটিসের কমপ্লিকেশান হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।

ব্যয়াম নিয়ে নতুন তথ্য
কিভাবে এক্সারসাইজ করলে ডায়াবেটিস ভালো নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং হার্টের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে? এ সম্পর্কিত ব্যয়াম নিয়ে একদম নতুন রিসার্চ এ বলা হয়েছে-
— ইন্টারভেল এক্সারসাইজ অর্থাত্ বিরতিপূর্ণ ব্যায়াম চলমানভাবে ব্যায়ামের থেকে ভালো। চলমান ব্যায়াম বলতে বলা হয়েছে, হাঁটা বা দৌড়ানোর ক্ষেত্রে একই গতিতে বা একইভাবে চলা। আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এভাবেই ব্যায়াম করে থাকি, কিন্তু নতুন রিসার্চে বলা হচ্ছে, গতির তারতম্যের মাধ্যমে ডায়াবেটিস এবং হার্টের স্বাস্থ্যকে আরও ভালো রাখা সম্ভব।
এজন্য হাঁটা বা দৌড়ানোর ক্ষেত্রে ৫ মিনিট একটু জোরে যেতে হবে, পরবর্তী ৫ মিনিট একটু ধীরে, অনেকটা স্বাভাবিক হাঁটার মতো। আবার পরবর্তী ৫ মিনিট জোরে। এভাবে ৪৫ থেকে ৬০ মিনিট ব্যয়াম করতে হবে ।

কীভাবে এই বিশেষ ব্যায়াম কাজ করে?
যখন আমরা স্বাভাবিকভাবে হাঁটি তখন আমাদের ব্রেন, হার্টের নার্ভাস সিস্টেম একটা সিঙ্ক্রোনাইজেশানের ভেতরে কাজ করে। হঠাত্-ই যখন কোনো গতির পরিবর্তন হয় তখন আমাদের ব্রেন এবং নার্ভাস সিস্টেমে পরিবর্তন আসে। প্যারাসিমপ্যাথেটিক সিস্টেম ডাউন রেগুলেটেড হয়ে, সিমপ্যাথেটিক সিস্টেম আপ রেগুলেটেড হয়। ফলে মাংস পেশি রেত রক্ত সঞ্চালন বেড়ে যায়। হার্ট দ্রুত কাজ করে আর কোষে এখটঞ ৪ রেগুলেটারি প্রোটিন আপ রেগুলেটেড হয়ে রক্তের গ্লুকোজকে কোষের ভেতরে নিয়ে যায়। এভাবেই কাজটা হয় কিন্তু একই গতিতে গেলে সাধারণত কাজটা একবারই হয়। আর ইন্টারভেল মেথডে ব্যায়াম করলে এটা প্রতিবার গতির পরিবর্তনের সঙ্গে হয়ে থাকে। ফলে কিছু মাস পর আমরা ডায়াবেটিসকে আরও ভালোভাবে নিয়ন্ত্রিত আকারে পাই। আর সবচেয়ে বড় যে ব্যাপারটা তা হলো- এতে বারবার গ্লুট ৪ ডাউন এবং আপ রেগুলেটেড হওয়ার কারণে কিছু মাস পর থেকে কোষের ইনসুলিন সেনসিটিভিটিও বাড়তে থাকে। অর্থাত্ অন্যান্য গ্লুটপ্রোটিনগুলোও আস্তে আস্তে কাজ করা শুরু করে।
লেখক : লেকচারার, এনাটমি বিভাগ
ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ (বারডেম), ঢাকা
 
                                                                                




 ২. ডায়াবেটিস রোগী ছাড়াও যাদের নিকটাত্মীয়ের ডায়াবেটিস আছে, যাদের ওজন বেশি, ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রমের কাজ তেমন করেন না, তারা নিম্নে উল্লিখিত রক্তের পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে ডায়াবেটিস সম্পর্কে জানতে পারেন।
খালি পেটে বা খাবারের আগে (Fasting Blood Glucose) : এ পরীক্ষাটি সকালে নাস্তার আগে খালি পেটে করতে হয়। এর স্বাভাবিক মাত্রা ৬.১ মিলিমল/লিটার বা তার কম।
খাবারের দুই ঘণ্টা পরে (2 Hour After Breakfast) : এ পরীক্ষাটি নাস্তা খাওয়ার দুই ঘণ্টা পরে করতে হয়। এর স্বাভাবিক মাত্রা ১০ মিলিমল/লিটার বা তার কম।
যে কোন সময় (জধহফড়স) : এ পরীক্ষাটি দিনের যে কোনো সময় করা যেতে পারে। এর স্বাভাবিক মাত্রা ৫.৫ থেকে ১১.১ মিলিমল/লিটার।
Oral Glucose Tolerance Test (OGTT) : যাদের খালি পেটে FBG 6.1 এর বেশি কিন্তু ৭.০ মিলিমল/লিটারের কম কিংবা দিনে যে কোনো সময় ৫.৫-এর বেশি কিন্তু ১১.১ মিলিমল/লিটারের কম, তাদের এ পরীক্ষাটি করা খুবই জরুরি। কারণ এ পরীক্ষাটির মাধ্যমে কারও ডায়াবেটিস আছে কি নেই, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাবে। এ পরীক্ষাটির জন্য রোগীকে প্রথমে খালি পেটে রক্ত দিতে হবে। এরপর ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ পানিতে মিশিয়ে খেতে হবে এবং ঠিক দুই ঘণ্টা পর রোগীকে আবার রক্ত দিতে হবে। এই দুই ঘণ্টা রোগী অন্য কোনো খাবার খেতে পারবেন না। কোনো ধরনের শারীরিক পরিশ্রমের কাজও করতে পারবেন না। ধূমপান করা যাবে না। এ পরীক্ষায় যে রোগীর খালি পেটে ৭.০ মিলিমল/লিটারের চেয়ে বেশি এবং দুই ঘণ্টা পর ১১.১ মিলিমল/লিটারের চেয়ে বেশি হবে তাকে নিশ্চিত ডায়াবেটিক রোগী হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে।

গ্লাইকোলাইলেটেড হিমোগ্লোবিন : এ পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তে গত ৪ মাসের গ্লুকোজের মাত্রার একটা ধারণা পাওয়া যাবে। এ পরীক্ষাটি খালি পেটে অথবা খাওয়ার পর যে কোনো অবস্থায় করা যায়। এর স্বাভাবিক মাত্রা ৭% নিচে থাকা বাঞ্ছনীয়।

ডায়াবেটিসের ভয়াবহতা
ডায়াবেটিসকে তাই বলা হয় সব রোগের মা। ডায়াবেটিসের জটিলতাগুলোই আসলে এই রোগের মূল সমস্যা। শরীরে এমন কোনো অঙ্গ নেই যেখানে ডায়াবেটিস তার ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করে না। উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ডায়াবেটিসকে মৃত্যুর চতুর্থ প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। ডায়াবেটিসে সাধারণত যেসব সমস্যা হতে পারে তা হলো—
— কিডনির অক্ষমতা বা কিডনি বৈকল্য। বিশ্বের অনেক মানুষ ডায়াবেটিসের কারণে কিডনির সমস্যায় ভোগে।
— বিশ্বে প্রতি ৩০ সেকেন্ডে একটি করে পা কাটা যাচ্ছে ডায়াবেটিসজনিত কারণে। আবার যত পা কেটে ফেলতে হচ্ছে, এর ৮৫ শতাংশের প্রধান কারণ রোগীদের অসচেতনতা।
— ডায়াবেটিসে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। চোখে রেটিনোপ্যাথি হয়ে চোখে কম দেখা, ঝাপসা দেখা, চোখের ছানিপড়া ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে। অন্ধত্ব ও দৃষ্টিবিচ্যুতির নানা কারণ ডায়াবেটিস।
— ডায়াবেটিস হলে হৃদরোগের ঝুঁকি এবং হার্ট অ্যাটাক হয়ে মৃত্যুর আশঙ্কা বাড়ে।
— ডায়াবেটিসে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে শরীরে বাসা বাঁধে নানা রকম ইনফেকশন। আবার পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি হলে হাত-পা জ্বালাপোড়া করাসহ বোধশক্তি কমে যায়। শরীরের মাংসপেশিগুলো দুর্বল হয়ে যায়।
দরকার সুশৃঙ্খল জীবন
কারও ডায়াবেটিস রোগ হলে সে যদি নিয়ম মেনে চলে তবে সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের চেয়েও সে ভালো থাকবে। ডায়াবেটিসে কেউ মারা যায় না যতক্ষণ না অন্য সমস্যাগুলো জটিল আকার ধারণ করে। ডায়াবেটিস নিরাময়যোগ্য নয় তবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য। নিয়ম মানলে একে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। পরিমিত খাদ্য, নিয়মিত ওষুধ ও সুশৃঙ্খল জীবন—এই তিনটি নীতি ডায়াবেটিসের রোগীরা সঠিকভাবে পালন করলে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবেন।

প্রতিরোধে করণীয়
সচেতনতা এবং সুশৃঙ্খল জীবনাচরণই ডায়াবেটিসের প্রধান চিকিত্সা। অনেক দিন ধরে বিভিন্ন গবেষণা করে দেখা গেছে, টাইপ-২ ডায়াবেটিস বহুলাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
— প্রথমেই খাবার-দাবারে নিয়ম মেনে চলতে হবে। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমিত সুষম খাবার গ্রহণ করতে হবে। চিনি, মিষ্টিযুক্ত খাবার (সফট ড্রিঙ্ক, চকলেট, কেক, পেস্ট্রি, কুকি ইত্যাদি) কম খেতে হবে। শাক-সবজি এবং আঁশজাতীয় খাবার খেতে হবে।
— ক্যালরিবহুল খাবার যেমন—তেল-চর্বিযুক্ত খাবার (তেল, ঘি, মাখন, ডালডা, চর্বি, ডিমের কুসুম, মগজ ইত্যাদি) কম খেতে হবে। ফাস্টফুড এড়িয়ে চললে ভালো। শর্করাবহুল খাবারগুলো (চাল, আটা ইত্যাদি দিয়ে তৈরি খাবার) কিছুটা হিসাব করে খেতে হবে। শাকসবজি, ফলমূল বেশি করে খেতে হবে। দৈনিক ক্যালরি হিসাব করে খাবার খেতে হবে। প্রয়োজনে পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিতে হবে।
— ফাস্ট-ফুড এবং কোল্ড-ড্রিঙ্কস পরিহার করতে হবে। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি পান করুন। বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে পরিবেশিত রিচ ফুড যথাসম্ভব পরিহার করুন।
— ধূমপানসহ ও তামাক বর্জন করতে হবে। অ্যালকোহল মোটেই নয়।
— একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ তা হলো কায়িক শ্রম ও ব্যায়াম। তবে প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট করে সপ্তাহে ১৫০ মিনিট দ্রুততায় হাঁটুন। সাইকেল চালান, সাঁতার কাটুন কিংবা সিঁড়ি ভাঙুন। মনে রাখবেন, রক্তের গ্লুকোজগুলোকে পোড়াতে হবে কাজের মাধ্যমেই।
— বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী আপনার উপযুক্ত ব্যায়াম নির্বাচন করুন। কারণ সব ব্যায়াম সবার জন্য উপযুক্ত নয়। ব্যায়াম করছেন এ ধারণা মাথায় রেখে অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ করবেন না।
— একটানা অধিক সময় বসে কাজ করবেন না। কাজের ফাঁকে উঠে দাঁড়ান। একটু পায়চারি করুন।
— উচ্চতা অনুযায়ী ওজন স্বাভাবিক মাত্রায় রাখার চেষ্টা করতে হবে। একই সঙ্গে মেদভুঁড়ি যেন না বাড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
— বিষণ্নতা ডায়াবেটিস বাড়ায়, তাই মনকে প্রফুল্ল বা মানসিক চাপমুক্ত রাখার চেষ্টা করতে হবে।
— খাওয়ার ওষুধ বা ইনসুলিন যাই হোক চিকিত্সা নিয়মিত চালাবেন। রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে থাকলে শরীরের সব অঙ্গই ঠিক থাকবে।
— শিশু-কিশোরদের মধ্যে আজকাল টাইপ-২ ডায়াবেটিস বেড়ে যাচ্ছে। তাই এরা যেন অপুষ্টিতে না ভোগে আবার অতিপুষ্টিতে ওজন না বাড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। একই সঙ্গে শিশুরা যেন শ্রমবিমুখ না হয়, তা দেখাও গুরুত্বপূর্ণ।
— গর্ভকালীন মায়ের পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে যেন গর্ভস্থ শিশু অপুষ্টিতে না ভোগে।
— একান্তই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের পরামর্শমত চিকিত্সা গ্রহণ করুন। ওষুধ, ব্যায়াম, খাদ্যগ্রহণ তথা সার্বিক জীবনযাপন সংক্রান্ত তার সুনির্দিষ্ট এবং বিজ্ঞানসম্মত নির্দেশনা (যা শুধু আপনার জন্য প্রযোজ্য) মেনে চলুন।

No comments:

Post a Comment